রাশিয়াতে শক্তিশালী লেসার রশ্মি ব্যবস্থা তৈরী নিয়ে পরিকল্পনা সংক্রান্ত আলোচনা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাপ- নিউক্লীয়১ শক্তি উত্পাদন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে. এই প্রকল্পের মূল্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন প্রায় ৪হাজার পাঁচ-শ’ কোটি রুবল বা দেড় শো কোটি ডলার অর্থ মূল্যের সমান হতে পারে.

    এই বিরল লেসার রশ্মি উত্পাদনের যন্ত্র তৈরী করা হবে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় এলাকার রাষ্ট্রীয় পারমানবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে, সারভ শহরে, যেখানে এই দেশের প্রথম পারমানবিক ও হাইড্রোজেন বোমা বানানো হয়েছিল. ভবিষ্যতের যন্ত্র থেকে যে লেসার রশ্মি বার হবে তার স্পন্দনের শক্তি প্রায় ২, ৮ মেগা জুল হতে চলেছে. বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী একই ধরনের যন্ত্রে লেসার রশ্মির শক্তি ২ মেগা জুলের বেশী হয় না. এই ধরনের ব্যবস্থার দুটি ধরনের ব্যবহার রয়েছে – সেই গুলি ব্যবহার করা হয়ে থাকে দেশের প্রতিরক্ষার সমস্যা সমাধানে ও জ্বালানী সমস্যা মেটানোর জন্য. এই কথা উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর লেসার পদার্থবিদ্যা ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর সের্গেই গারানিন বলেছেন:

    “প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – পারমানবিক পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারণে – এই ধরনের ব্যবস্থা আমাদের পারমানবিক অস্ত্র যারা ব্যবহার উপযুক্ত রাখেন সেই সব বিশেষজ্ঞদের অস্ত্রের নিরাপত্তা ও ভরসা যোগ্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে. দ্বিতীয় হল- এই যন্ত্র সেই সমস্ত বিশেষজ্ঞদের কাছে আগ্রহ জনক, যারা উচ্চ ঘনত্ব সম্পন্ন শক্তি নিয়ে গবেষণা করে থাকেন. আর তা ভবিষ্যতে তাপ- নিউক্লীয় শক্তি উত্পাদন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে”.

    এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন গত শতকের মদ্য ভাগ থেকেই নানা দেশের বিজ্ঞানীরা. কিন্তু আপাততঃ পরীক্ষা পর্যায়েই রয়ে গিয়েছে সমস্ত উদ্যোগ. লেসার রশ্মি ব্যবস্থার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা সারভ শহরে তথাকথিত সম্মিলিত পরীক্ষাগার তৈরী করতে চান, যেখানে শুধু রুশ বিজ্ঞানীরাই নন, এমনকি সেই সমস্ত দেশের বিজ্ঞানীরা, যারা এই ধরনের যন্ত্র আগেও তৈরী করেছেন, তারাও যোগ দিতে পারেন. এক্ষেত্রে মার্কিন, জাপানী ও চিনা বিজ্ঞানীদের কথাই হচ্ছে. এই ধরনের সম্মিলিত কাজ সকলেরই উপকারে লাগবে. কারণ কোন একটা সময়ে সমস্ত খনিজ তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যাবে এবং পারমানবিক রিয়্যাক্টরের জন্য জ্বালানীর ভাণ্ডারও অসীম নয়, তাই সের্গেই গারানিন আরও বলেছেন:

    “যারা এই ধরনের পরীক্ষা করছেন, তারা বোঝেন যে, আগামী দিনের শক্তি সরবরাহ হবে এই ধরনের উত্স থেকেই. যে মুহূর্তে ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীরা সমস্ত পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন, তখনই আমি মনে করি যে, প্রযুক্তিবিদরা এগিয়ে আসবেন, আর ইচ্ছা হবে এর উপরে ভিত্তি করে একটি প্রদর্শন যোগ্য তাপ – নিউক্লীয় রিয়্যাক্টর তৈরী করা হবে”.

    যে বাড়ীতে এই যন্ত্র বসান হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার আয়তন তিনটি ফুটবল মাঠের সমান ও উচ্চতা দশ তলা বাড়ীর মতো. এই যন্ত্র তৈরীর জন্য বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, যার ফলে সময় অনেক কমানো সম্ভব হবে. আমেরিকা ও ফ্রান্সের বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের যন্ত্র তৈরী করেছেন যথাক্রমে ১২ ও ১৫ বছর ধরে, আর রুশ লোকরা ঠিক করেছেন নয় বছরেই তা বানিয়ে ফেলতে.

১) উত্স উইকিপিডিয়া  - তাপ-নিউক্লীয় বিক্রিয়ক বা ফিউশান বিক্রিয়ক এটি এমন এক বিক্রিয়ক যার মধ্যে নিউক্লীয় ফিউশান্ ঘটে কিন্তু মুক্তি প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ থাকে নিয়ন্ত্রিত। যদিও তাপ-নিউক্লীয় বিক্রিয়ককে এখনও বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়নি, তবুও বিশ্ব জুড়ে অসংখ্য বিজ্ঞানী এমন একটি যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ণের লক্ষ্যে নিরন্তর গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ তাপ-নিউক্লীয় বিক্রিয়কের সফল নির্মাণের প্রতিকূলে রয়েছে দু'টি কেন্দ্রীয় সমস্যা:

বিক্রিয়াকারী কেন্দ্রীণ সমূহকে বিপুল প্রজ্বলন তাপমাত্রায় (একটি ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম বিক্রিয়ার জন্য যার মান প্রায় ৪০ × ১০৬ K কেলভিন) উত্তপ্ত করা। বিক্রিয়াকারী কেন্দ্রীণ সমূহকে যথেষ্ট ক্ষণ ধরে রাখা, যাতে ফিশান্ বিক্রিয়ায় মুক্তি প্রাপ্ত শক্তির মান বিপুল প্রজ্বলন তাপমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় শক্তিকে ছাড়িয়ে যায় (ল্বসান্ শর্তদেখুন)।

যে দুটি পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে সেগুলি হলোঃ চৌম্বকীয় অবরোধ এবং বটিকা ফিউশান। বদ্ধ প্রান্তীয় চৌম্বকীয় অবরোধ পদ্ধতিতে টোকাম্যাক নামক একটি টরয়েড আকৃতির বিক্রিয়কের মধ্যে প্লাজমা ধারণ করা হয়। এই বিক্রিয়কের মধ্যে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে আয়নিত প্লাজমাকে নির্দিষ্ট পথে এমন ভাবে চালনা করা হয় যেন প্লাজমা কণাগুলি ধারকের দেওয়ালের সংস্পর্শে আসতে না পারে। আর মুক্ত প্রান্তীয় চৌম্বক ব্যবস্থায় একটি ঋজু বিস্তার রোধ পাত্রের দুই মুখে তৈরী করা চৌম্বক আয়না যুগল (শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র যুগল) এর মাঝে প্লাজমাকে আটকে ফেলা হয়। বটিকা ফিউশান পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো নিউক্লীয় জ্বালানীর একটি ছোট্ট বটিকাকে লেজার বা ইলেকট্রন-রশ্মির সাহায্যে উত্তপ্ত করে এত দ্রুত সংকুচিত করা যে, বটিকাটি শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ার আগেই যাতে ফিউশান্ ঘটে যায়।

বর্তমান বৃহত্তম পরীক্ষাটি হল যৌথ ইউরোপিয়ান টোরিস বা যে ই টি (Joint European Torus)। ১৯৯৭ সালে, যে ই টি বা JET সর্বাধিক ১৬.১ মেগা ওয়াটের (২১,৬০০ hp) ফিউশান বিক্রিয়ক (নিবেশ ক্ষমতার ৬৫%) তৈরি করেছিল, ১০ মেগা ওয়াটের (১৩, ০০০ hp) ফিউশান বিক্রিয়ক সাথে যা ০.৫ সেকেন্ড ওপর ধরে রাখে ছিল। অতিরিক্ত ভাবে, ২০১০ সালের দিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন উঁচু ক্ষমতা পূর্ণ লেসার শক্তির গবেষণা সুবিধা (High Power laser Energy Research facility (HiPER)) প্রস্তুতি মূলক সম্ভাব্য নকশা তৈরি করতে চেয়েছিল[১]