মহাকাশে প্রথম যারা গিয়েছিলেন, তাঁদের বহু দিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে. সাইবেরিয়ার ক্রাসনোইয়ারস্ক শহরের বিজ্ঞানীরা মানুষের জীবন যাপন করার মতো সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া ব্যবস্থা তৈরী করার কাছে পৌঁছেছেন. অন্য মহা জাগতিক বস্তুর উপরে মানুষের থাকার মতো ঘাঁটি তৈরী করতে গেলে স্বয়ং সম্পূর্ণ জৈব শৃঙ্খল ব্যবস্থা ছাড়া উপায় নেই, তাই সেটা ছাড়া পরবর্তী কালে মহাকাশ বিজয়ের পথও ভাবনার অতীত. এখন এই প্রশ্ন আরও বেশী করে বাস্তব: চাঁদের উপরে ঘাঁটি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তৈরী হতে চলেছে, ২০২০ সালেই.

    এই ধরনের ব্যবস্থা মানুষের জন্য শ্বাস নেওয়ার মতো হাওয়া, জল ও খাবার দাবার দিতে বাধ্য, তার বেঁচে থাকার নানা রকমের জৈব শৃঙ্খলের থেকে উত্পাদিত বিষয়কেও পরিবর্তিত করতে বাধ্য. বাইরে থেকে আসবে শুধু আলো আর বিদ্যুত শক্তি. এই কমপ্লেক্স হতে হবে ছোট, কারণ তা মহাকাশে পাঠাতেও হবে. প্রায় একই সময়ে মহাকাশ অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত দেশে এই রকমের আবদ্ধ জৈব শৃঙ্খল ব্যবস্থা সৃষ্টির কাজ শুরু হয়েছিল আর তা রাখা হয়েছিল খুবই গোপনীয় হিসাবে.তখন মহাকাশ অভিযান নিয়ে প্রতিযোগিতা খুবই চাপ সৃষ্টি করে রেখেছিল: দুই দেশই ১৯৬০ এর দশকে চাঁদ ও মঙ্গলে ঘাঁটি গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল আর তার জন্য তৈরী করছিল রকেট পরিবহনের ব্যবস্থাও.

    প্রথম ও সবচেয়ে উপযুক্ত অংশ এই জৈব শৃঙ্খল গড়ার জন্য হল ভাল করে গবেষণা করে দেখা ক্লোরেল্লা নামের এক কোষ বিশিষ্ট জলজ উদ্ভিদ, যা আলোতে দ্রুত বাড়তে পারে এমন জৈব বস্তু ও অক্সিজেন দিতে পারে. ক্লোরেল্লা মহাকাশচারীদের শ্বাস নেওয়ার সমস্ত সমস্যা কম করে দেয়. এটা অবশ্য স্পষ্ট যে, মাঝের কয়েক ধাপ পার না হয়ে উপায় নেই. এর জন্য প্রয়োজন মাটির ব্যাকটেরিয়া, যা ক্লোরেল্লা থেকে তৈরী জৈব বস্তু ও মানুষের রেচন প্রক্রিয়ার থেকে পাওয়া পদার্থকে কমপোস্ট সারে পরিণত করে, আর তা আবার নানা রকমের উদ্ভিদ, ফল ও সব্জীর জন্য উপযুক্ত জমির কাজ করে. রাশিয়াতে বায়োস নামের কমপ্লেক্সে এই ধরনের গবেষণা করা হচ্ছে. এখন ক্রাসনোইয়ারস্কের লোকেরা এক গুণগত ভাবে উন্নতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন, এই কথা “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করে সাইবেরিয়ার বায়োফিজিক্স ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী আন্দ্রেই দেগেরমেনঝি বলেছেন:

    “আমরা এখন একটা এমন অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছি, যাতে আর বছর দুইয়ের মধ্যেই শতকরা ১০০ ভাগ জৈব ভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পৌঁছতে পারবো. আমাদের আগের প্রজন্ম পেরেছিলেন শতকরা ৬০- ৭০ ভাগ বিচ্ছিন্ন হতে. বদ্ধ শৃঙ্খল প্রয়োজন স্থায়ী বাসযোগ্য ঘাঁটির জন্য – চাঁদে, মঙ্গলে. আর চাঁদ ও মঙ্গলে রয়েছে জল, কিছু জিনিস খনিজ থেকেও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু মানুষের এই সব ব্যবহারের উপরে সম্ভবতঃ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে”.

    আমেরিকার লোকদের এই ধরনের প্রকল্পের নাম ছিল “বায়োস্ফিয়ার – ২” – এই কৃত্রিম বাগান প্রায় দেড় হেক্টর জমির উপরে ছোট প্রাণী, পাখী, সাপ, জলাশয় ও মরুভূমি দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল. ৮ জন মানুষ নিয়ে এখানে পরীক্ষা চলেছিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত. রাশিয়ার প্রকল্প শুধু ছোটই নয়, বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রাখে.

    বর্তমানে ক্রাসনোইয়ারস্কের বিজ্ঞানীদের উপরে গোপনীয়তার বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে. বর্তমানে প্রকাশিত তথ্যের ফলে বিদেশের বিজ্ঞানীদের এই প্রকল্পের উপরে আগ্রহ অনেক বেড়েছে. আন্দ্রেই দেগেরমেনঝি বলেছেন, চিন দেশের লোকেরা এই পুরো ল্যাবরেটরী কিনে নিয়ে নিজেদের দেশেই নিয়ে যেতে চেয়েছিল. আর ইউরোপের মহাকাশ সংস্থা এর মধ্যেই অর্থ দিয়েছে, যাতে সেখানে পরীক্ষা করা যায়, যা বুঝতে সাহায্য করবে বদ্ধ অবস্থায় অতি ক্ষুদ্র জৈব বস্তুর উপরে কি প্রভাব পড়ে. এই পরীক্ষার ফল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেও আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করা হচ্ছে: এই স্টেশনের মহাকাশ অভিযাত্রীরা সমস্ত জায়গায় নানা রকমের মাইক্রোব ও শ্যাওলা ধরানো ছত্রাকের সঙ্গে লড়াই করে হাঁপিয়ে উঠেছেন.

    জল ও জৈব বস্তুর আবদ্ধ পুনর্সংযোজন সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা বিশ্বের বেশ কয়েকটি জায়গার ল্যাবরেটরীতে করা হচ্ছে, বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক দল দিয়ে, কিন্তু আপাতত কেউই এই বিষয়ে পুরো সফল হতে পারেন নি. খুব বড় রকমের সম্ভাবনা রয়েছে যে, রাশিয়ার লোকেরা তাদের বায়োস প্রকল্প নিয়ে এই বিষয়ে প্রথম হতে পারেন.

    কিন্তু বায়োস শৃঙ্খল তৈরী হলেও গবেষণা থেমে থাকবে না, তখন তৈরী করতে হবে তথাকথিত দুর্ঘটনা ঘটার পরের শৃঙ্খল – চাঁদের ঘাঁটিতে সত্যিকারের দুর্ঘটনা ঘটলে তারপরে কি হতে পারে, তা নিয়ে. সেখানে এত রকমের সম্ভাবনা রয়েছে, যে তা নিয়ে গবেষণায় অনেক বছর লাগবে পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে. তাড়াতাড়ি করতে হবে, বলেছেন বায়োফিজিক্স বিজ্ঞানী: এই কমপ্লেক্স চাঁদে পাইলট চালিত উড়ানের আগেই সম্পূর্ণ করতে হবে.