রাশিয়ার ধ্রুপদী সাহিত্যের জ্যোতিষ্ক লেখকেরা বিশ্বের বিভিন্ন জাতির সাহিত্যের বৃহত্তম প্রতিনিধিদের খুবই আস্থার সঙ্গে এখনও অতিক্রম করে চলেছেন. এই খল পাওয়া গিয়েছে গ্রেট ব্রিটেন ও আমেরিকার আধুনিক লেখকদের মধ্যে আয়োজিত এক বিস্তীর্ণ মতামত মূল্যায়ন করে.

    এক-শোরও বেশী ইংরাজী ভাষায় সাহিত্য রচয়িতা লোকের মধ্যে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর দশটি মহান তম সাহিত্য কর্ম ও লেখকদের এক রেটিং তৈরী করা হয়েছিল. সবচেয়ে বেশী বার যে নাম গুলি উঠেছে, সেগুলি – লেভ তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আন্তন চেখভ ও ভ্লাদিমির নাবোকভ. রুশী ধ্রুপদী সাহিত্যের লেখকেরা শুধু প্রত্যেক বাছাইয়ের মধ্যেই নেই, বরং সেই গুলিতে শীর্ষ স্থানেই রয়েছেন, এমনকি পিছনে ফেলেছেন এমন সব নাম যেমন – শেক্সপিয়র, ফ্লব্যের অথবা ফিটজেরাল্ড. তাহলে কি হল, দেখা যাক এই তালিকা খুঁটিয়ে.

    বিংশ শতাব্দীর দশটি সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসের প্রধান ভ্লাদিমির নাবোকভের স্ক্যান্ডাল করে বিখ্যাত হওয়া উপন্যাস “লোলিতা” – যাকে বলা হয়েছে গত শতকের প্রধান বই ও লেখক বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক বলে. কিন্তু এই উপন্যাসের মশলা যুক্ত ইতিহাস, যা নাবোকভ ভেবে বার করেছিলেন, সেটাই এই উপন্যাসের বিখ্যাত হওয়ার কারণ হয় নি ও তা তালিকার শীর্ষে ওঠার কারণ হয় নি. রাশিয়ার সাহিত্য সমালোচক ইগর শৈয়তানভ এই কথা উল্লেখ করেছেন যে, নাবোকভের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ভবিষ্যতের সাহিত্যের একটা পূর্বাভাস আগে থেকেই দিতে পারা, তিনি বলেছেন:

    “নাবোকভ সেই সমস্ত লোকের একজন ছিলেন, যিনি তথাকথিত আধুনিকোত্তর যুগের প্রথম উত্স ছিলেন – বর্তমানে “আত্ম প্রতিফলন” মূলক সাহিত্যের পথিকৃত, যখন লেখক একই সময়ে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে লিখতে থাকেন. আর এই জিনিসটাই, যে “আমি কি করে লিখি”, সেটাই নাবোকভের ক্ষেত্রে একটা বিষয় হয়েছে”.

    এখানে উল্লেখযোগ্য হল, উনবিংশ শতকের সেরা উপন্যাস বাছাই করার ক্ষেত্রেও ইংরাজী ভাষার আধুনিক লেখকদের জন্য এক মহিলাকে নিয়ে সেই সময়ে যথেষ্ট স্ক্যান্ডাল হওয়া বই সবচেয়ে মুখ্য হয়েছে. এটাও রুশ ধ্রুপদী সাহিত্যের উপহার – লেভ তলস্তয়ের “আন্না কারেনিনা”. প্রসঙ্গতঃ, “আন্না কারেনিনা” উপন্যাসের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা কোন রকমের মতামত না নিয়েও কল্পনা করার যোগ্য. ইংরাজী ভাষায় এই উপন্যাস কম করে হলেও চারবার অনুদিত হয়েছে, কতবার ছাপা হয়েছে, তা বলা যায় না. আর বহুবার সিনেমার পর্দায় সেটি দেখানো হয়েছে, এই কথা ভাবলে বলা যেতে পারে সাহস করে যে, সারা বিশ্বেই লোকে এই উপন্যাস জানে. সকলেই জানে যে, এক রুশ বনেদী ঘরের মহিলা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে চলে গিয়েছিলেন, এক প্রেমিকের হাত ধরে আর শেষে ট্রেনের তলায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন. প্রসঙ্গতঃ, গভীর মনোযোগী পাঠকের নজরে এই উপন্যাসের নায়িকা একেবারেই “আন্না কারেনিনা” নন. প্রধান নায়ক – জমিদার কনস্তানতিন লেভিন: একেবারেই ইতিবাচক চরিত্র, যিনি পারিবারিক মূল্যবোধ বিষয়ে খুবই স্পর্শকাতর. এই ধরনের ব্যাখ্যার সমর্থনে রুশী ধ্রুপদী লেখকের জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে সেটাই বলে দেয় যে, এই তালিকার তৃতীয় সারিতেও উনবিংশ শতকের মহান তম সাহিত্য কর্মের মধ্যে তাঁরই লেখা “যুদ্ধ ও শান্তি” উপন্যাস রয়েছে, যেখানে বহু চরিত্রের ঘনঘটা, যা নকল করা উচিত সাহিত্য কর্মের ক্ষেত্রে. আবার এই শক্তিশালী দশ টির মধ্যেই লেভ তলস্তয়ের এক ধরনের “প্রতিপক্ষ” ফিওদর দস্তয়েভস্কির “অপরাধ ও শাস্তি” রয়েছে. আর এটাও বোধগম্য. দস্তয়েভস্কি ছাড়া উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দী চিন্তা করা যায় না, তাই এই নিয়ে রুশ সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ইগর ভোলগিন বলেছেন:

    “দস্তয়েভস্কি শুধু একজন লেখকই নন, তিনি একজন বিশ্ব বোধের মাত্রা, কারণ বিশ্বই দস্তয়েভস্কির পরে একটু অন্য রকমের হয়ে গিয়েছে, কারণ মানুষ নিজের সম্বন্ধে অনেক বেশী জানতে পেরেছে, তাঁর আগে যতটা জানত, তার চেয়ে”.

    এই ধরনের দৃষ্টিকোণ লেখক পাভেল বাসিনস্কি কিছুটা মেনে নিয়েছেন, যখন তাঁকে গ্রেট ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেখকদের বাছাই সম্বন্ধে বলতে বলা হয়েছিল, যাঁরা প্রসঙ্গতঃ লেভ তলস্তয়কেই সমস্ত সময়ের সেরা লেখকের আখ্যা দিয়েছেন. তাই বাসিনস্কি বলেছেন:

    “বিংশ শতাব্দী – এটা অবশ্যই, দস্তয়েভস্কির যুগ ছিল, - এই লেখক নিজের যুগেরই বেশী উপযুক্ত ছিলেন, -যা ছিল বিস্ফোরক, বৈপ্লবিক, মূল্যবোধের অন্তহীণ পুনর্মূল্যায়নের সময়, “অস্তিত্ববাদ” নিয়ে প্রশ্ন ও অন্যান্য প্রশ্নের উদয় কালে. তলস্তয় এই প্রশ্ন গুলিকে স্থাপন করেন নি. তলস্তয় উপস্থাপনা করেছিলেন, কি করে প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হয়, হবে, সেই সব প্রশ্ন গুলিকেই. আর তাই, আমার মনে হয়েছে একবিংশ শতকের লেখক এই পরিস্থিতিতে হয়ে উঠছেন লেভ তলস্তয়”.

    এরই মধ্যে পাভেল বাসিনস্কি কম বিস্মিত হন নি যে, উনবিংশ শতকের সেরা গল্পের মধ্যে আন্তন চেখভের গল্পই পড়েছে, তাঁর নাটক নয়. আর এটা – চেখভের নাটকের সারা বিশ্বে যত বার ও যত রকম ভাবে অভিনীত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সত্য বলেই মনে হয়. সাধারণত, সকলেই বলে থাকেন যে, চেখভের গল্প – এটা নভেল, - এটা অই কারণে যে, চেখভের নায়ক তাঁর সামাজিক নয়, বরং মনস্তাত্বিক অস্তিত্ব দিয়েই দেখানো হয়েছে. আর তার শেষ গুলি নভেল ও নাটকে একই রকমের অকল্পনীয়. ঠিক করে বলতে হলে বলা উচিত্, তার আসলে কোন শেষ নেই. চেখভ কোন জট ছাড়াতে দেন নি, কারণ জীবনও তা দেয় না.

    এই সব সময়ের বাস্তব জীবনমুখী সাহিত্য – চেখভের, তলস্তয়ের, দস্তয়েভস্কির বোধহয় একমাত্র কারণ সব রকমের রেটিংয়ে এই ধ্রুপদী সাহিত্য স্রষ্টাদের অবিরত উপস্থিতির, আর তা শুধু ইংরাজী ভাষাতেই নয়, বিশ্বের যে কোন প্রসারিত ভাষাতেই.