গত কয়েক দিনের মধ্যে খবরের শিরোনামে এসেছে আন্টার্কটিকা. চাঞ্চল্যকর খবর যে, রুশ গবেষকরা বৃহত্তম হিমশিলা আবৃত হ্রদ ভস্তকের জল তলে পৌঁছতে পেরেছেন, তা সমগ্র বৈজ্ঞানিক সমাজকেই জাগিয়ে দিয়েছে. দ্বিতীয় খবর হতে পারে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবুও আন্টার্কটিকা এলাকায় কাজ করা লোকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: এখানে সেন্ট পিটার্সবার্গের বিখ্যাত রুশ জাদুঘরের ভার্চুয়াল শাখা খোলা হয়েছে.

    অতিকায় বরফের স্তরে ঢাকা শান্তি ও সহযোগিতার মহাদেশে, যা কোন দেশেরই অধিকারে নেই, যেখানে কেউই স্থায়ী ভাবে থাকেন না, আর সভ্যতার দ্বীপ গুলি বৈজ্ঞানিক স্টেশন ও ঘাঁটি গুলির চারপাশ ঘিরে রয়েছে, সেখানে মানুষের কাজের সমস্ত সর্বোচ্চ অর্জন জমা হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ এটা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ধারণারই নয়, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদেরও বটে. আর মনে তো হয় না যে, প্রায় দুশো বছর আগে আন্টার্কটিকা মহাদেশের প্রথম উদঘাটন কারী প্রথম রুশ দক্ষিণ মেরু অভিযানের নাবিকরা ফাদেই বেল্লিনসহাউজেন ও মিখাইল লাজারেভের নেতৃত্বে পৌঁছে ধারণা করতে পেরেছিল যে, কখনও বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষিণ প্রান্তের বিন্দুতে চারুকলার সেরা নিদর্শন গুলিও পৌঁছতে পারবে...

    আর এটাই নোভোলাজারেভস্কায়া রুশ মেরু স্টেশনে ঘটেছে, যেখানে খোলা হয়েছে রুশ জাদুঘরের ভার্চুয়াল শাখা. প্রসঙ্গতঃ, এটি এই মাল্টিমীডিয়া প্রোজেক্টের শততম ঠিকানা, যার কল্যাণে সেন্ট পিটার্সবার্গের রুশ জাদুঘরের সংগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে, আর তারই সঙ্গে দেশের বাইরেও, গ্রীসে, ভারতে, চিনে, বেলজিয়ামে. আন্টার্কটিকাতে শিল্প যারা পছন্দ করেন, তাঁদের এমনকি ইন্টারনেটে খোঁজ করারও দরকার নেই. সমস্ত প্রযোজনীয় তথ্য ও প্রোগ্রাম একটি ২০০ গিগাবাইট হার্ড ডিস্ক ভর্তি করে পাঠানো হয়েছে. সংগ্রহের সাথে পরিচয় হয় এক ভার্চুয়াল ত্রিমাত্রিক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে চলার সময়ে. রুশ জাদুঘরের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির গুসেভ যেমন উল্লেখ করেছেন যে, প্রথমে এই ভার্চুয়াল শাখা খোলা হয়েছে বৈজ্ঞানিক সমাজের জন্য, সেই সমস্ত মানুষের জন্য, যাঁরা বহু দিন ধরে গবেষণা অভিযানে সেখানে আছেন. রুশ জাদুঘরের প্রোগ্রাম আরও একটি যোগ সূত্র হবে মেরুর লোকেদের বিশ্বের জনবহুল অঞ্চল গুলির সঙ্গে, তার উপরে আমরা এই সংগ্রহে একটি নিজস্ব ধরনের আন্টার্কটিকার সুর দিয়েছি, বলেছেন ভ্লাদিমির গুসেভ:

    “রুশ জাদুঘরে বেল্লিনসহাউজেন মেরু অভিযান দলের এক শিল্পী পাভেল মিখাইলভের আঁকা ছবি রয়েছে, এটা ১৮১৯ - ১৮২১ সালে আঁকা ছবি. তিনি ভস্তক নামের পাল তোলা জাহাজে ছিলেন, যেটা চড়েই আন্টার্কটিকা আবিষ্কার করা হয়েছিল. আর এই শিল্পীর সেই সব প্রথম জল রঙে আঁকা ছবি রয়ে গিয়েছে – আন্টার্কটিকার নানা নিসর্গ দৃশ্য”.

    নিসর্গ সেই সময়ের পরে নিঃসন্দেহ ভাবেই বদলে গিয়েছে. যেমন, দক্ষিণ স্কটল্যান্ডের দ্বীপপূঞ্জের ওয়াটারলু দ্বীপে রয়েছে কাঠের ত্রৈক্য গির্জা. এর কাঠ সাইবেরিয়ার থেকে নিয়ে যাওয়া কেদার ও লার্চ গাছের, ২০০৪ সালে সমুদ্র পথে এই কাঠ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর পনেরো মিটার উঁচু এই গির্জাঘর সরাসরি দ্বীপেই জুড়ে লাগানো হয়েছিল. এটা বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষিণের গির্জা. আর ২০০৭ সালে নোভোলাজারেভস্কায়া স্টেশনে প্রথম তৈরী হয়েছিল... রুশ বানিয়া বা স্নান ঘর. সেটিও আন্টার্কটিকাতে প্রথম ম্যাপল কাঠের জুড়ে লাগানো বাড়ী ও রুশ রেকর্ড বইতে জায়গা পেয়েছে.

0    এই সবই, অবশ্য, এই কারণে করা হচ্ছে যে, বিজ্ঞানীদের এখানে কাজের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী হয়, আর আন্টার্কটিকার রহস্য উদ্ধারের কাজ হয়. এর একটি যুক্ত রয়েছে ভস্তক হ্রদের বরফের নীচের জলের সঙ্গে, যা প্রায় চার কিলোমিটার গভীরে চাপা পড়েছিল. প্রায় দুই দশক ধরে চির হিম শিলার মধ্যে গর্ত খোঁড়া হয়েছে, আর এই এবারে রুশ বিজ্ঞানীরা অবশেষে এই বৃহত্তম আন্টার্কটিকা অঞ্চলের হ্রদের জলের পৃষ্ঠে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন: এই হ্রদের দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার, প্রস্থ ৫০ কিলোমিটার. সেখানে রয়েছে বিশাল পরিমানে পানীয় জলের ভাণ্ডার. ৫ লক্ষ বছরের বেশী সময় ধরে এই জল ছিল সম্পূর্ণ পৃথিবীর বাইরের অঞ্চলের থেকে বিচ্ছিন্ন, আবহাওয়া ও সূর্যের আলোর সাথে কোন সংস্পর্শে না এসে. এখন বিজ্ঞানীদের কাজ হল – সেই জলে অভিযোজনের প্রক্রিয়া কি ভাবে হয়েছে, অথবা সেই বিষয়ে আশ্বস্ত হতে যে, তাতে জীবন্ত কোন কিছুই নেই. আর এটা, সম্ভবতঃ আমাদের মানুষের এই বিশ্বে কি ইতিহাস তার সম্বন্ধে ধারণাই পাল্টে দেবে.