মঙ্গলবার ৭ই ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়েছে. পালন করেছে বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা, এই দিবস পালন করা হয়েছে ইউরোপীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থা ইনসেফ সংস্থার তরফ থেকে. এবারে সেটা হয়েছে খুবই জোরালো সেন্সর, কপিরাইট প্রসঙ্গ ও ইন্টারনেটে বাক্ স্বাধীনতা নিয়ে. প্রসঙ্গতঃ এই বিতর্ক হচ্ছে বিভিন্ন সর্বোচ্চ মহলেও. বিশ্লেষকরা এর মধ্যেই আপাততঃ অনধিকৃত “সপ্তম মহাদেশ” দখলের লড়াই বলে একে নামকরণ করেছেন.

    রাশিয়াতে এই দিন সম্মেলনের মাধ্যমে পালিত হচ্ছে, যেখানে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে. সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিদের মূল আলোচ্য বিষয় – “শিশু কিশোর দের নিরাপত্তা”. কারণ বর্তমানে বেড়ে ওঠা প্রজন্মই ইন্টারনেট জালের সবচেয়ে ফাঁদে পড়ার উপযুক্ত দূর্বল প্রাণী, এই কথা “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করে নিরাপদ ইন্টারনেট লীগের ডিরেক্টর দেনিস দাভীদভ বলেছেন:

    “প্রাথমিক ভাবে ইন্টারনেটে কিভাবে আলোচনা করা উচিত্, তার অভ্যাস স্কুলে থাকেতেই করা দরকার. দ্বিতীয়তঃ – সাইবার বিপদ সম্পর্কে বাবা মায়েদের বেশী করে জানানো প্রয়োজন. শতকরা ৯৭ ভাগ রুশ লোক ভাবতেই পারেন না, কি বিপদের সামনে পড়তে পারে তাদের ছেলেমেয়েরা এই ইন্টারনেটে. অবশ্যই প্রাথমিক ভাবে যা মাথায় আসে, তা হল ইন্টারনেটের নিরাপত্তার জন্য বাবা মায়েদের পক্ষ তেকে নিয়ন্ত্রণের চাবি দেওয়া, য়া বাচ্চাকে সেই সব সাইটে যেতেই দেবে না, যার থেকে ক্ষতি হতে পারে”.

    পর্ণোগ্রাফি, মাদক ব্যবহার এই সব ধরনের বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষার প্রচেষ্টা যদিও আজ সবার উপরে রয়েছে, তাও এই গুলি থেকে রক্ষার উপায় সমাধান যোগ্য, কিন্তু আজ ইন্টারনেট ও তার চারপাশ জুড়ে যা হচ্ছে, তা দেখা গিয়েছে অনেক বেশী গভীর ও গুরুতর. সাধারন গ্রাহকেরা ইন্টারনেটকে ভাবেন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ, খানিকটা বাড়ীতে ব্যবহারের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির মতো, তাও একই সময়ে কৃত্রিম বাস্তবে যা রয়েছে, তা খুবই উঁচু রাজনীতির স্বার্থের আওতায় চলে এসেছে. আর এটা অবাক হওয়ার মতো কিছু না: প্রত্যেক বছরের সঙ্গেই ইন্টারনেটে “জনসংখ্যা” বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে তাদের উপরে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাও বাড়ছে, এই কথা উল্লেখ করে প্রতিদ্বন্দ্বীতা মূলক গোয়েন্দাবৃত্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ইভগেনি ইউশ্যুক বলেছেন:

    “ইন্টারনেট প্রাথমিক ভাবে স্বাধীনচেতা ও অনেক আইনকে কলা দেখানো লোকেদের জায়গা হয়েছিল. এখন ইন্টারনেটে সরকারি বৈদ্যুতিন পরিষেবা দেওয়া চালু হচ্ছে – এটা বাস্তবে, বহু লোককে ইন্টারনেটে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে. আর প্রাথমিক ভাবে এখানে পথ করা লোকেদের সঙ্গে নতুন লোকেদের নিয়মের মধ্যে বিরোধ তৈরী হচ্ছে”.

    কি আইন মেনে ইন্টারনেটে লোকেদের চলা উচিত্, তা নিয়ে প্রায়ই আড়াআড়ি ভাবে বিপরীতে থাকা মত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এর চোখে দেখার মতো উদাহরণ – কিছু দিন আগের কূটনৈতিক তরজা, যার সক্রিয় কুশীলব হয়েছেন মস্কো ও ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূতেরা. ডিসেম্বর মাসে ইউরোপীয় সঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভিলনিউস শহরের সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন পেশ করেছিলেন – “ডিজিট্যাল যুগে ভিত্তি মূলক স্বাধীনতা সম্বন্ধে ঘোষণা”. তিনি যেরকম ঘোষণা করেছিলেন যে, ভিত্তিমূলক স্বাধীনতা – বাক্ স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা, জোট গঠনের স্বাধীনতা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা – টুইটার মত বিনিময়ে, ফেসবুক আয়োজিত গোষ্ঠীতে, ততটাই প্রয়োগ যোগ্য যতটা মিছিল সমাবেশের ক্ষেত্রে. রাশিয়া ও আরও কিছু দেশ এই দলিল আটকে দিয়েছে. আর এর পরে যখন শ্রীমতী ক্লিন্টন রাশিয়ার লোকসভা নির্বাচনকে “স্বাধীন নয়” বলে উল্লেখ করেন, তখন রুশ পররাষ্ট্র প্রধান সের্গেই লাভরভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে “জোর করে ডাবল্ স্ট্যান্ডার্ড চাপিয়ে দিচ্ছে” বলে অভিযুক্ত করে ভিলনিউস ছেড়ে চলে আসেন, এই সম্মেলনের ফলাফল প্রকাশ অবধি অপেক্ষা না করেই.

    মনে করিয়ে দিই ইন্টারনেটে টুইটার ও ফেসবুক সাইটে গোষ্ঠী তৈরী করা দিয়েই গত বছরে আরব দেশ গুলিতে বিপ্লবের সূত্রপাত হয়েছিল. এটাও আজ গোপন নয় যে, রাশিয়ার বিরোধী পক্ষের বিক্ষোভ আয়োজনও সামাজিক সাইট ব্যবহার করেই হয়েছিল. আর এই ধরনের স্বাধীনতা হোয়াইট হাউস থেকে সমর্তনের কথাই বলা হচ্ছিল. কিন্তু সের্গেই লাভরভের “ডাবল্ স্ট্যান্ডার্ড” কথাও শুধু কোন কূটনৈতিক বুলি নয়. সেই আরবদের ইন্টারনেটের বিষয়ে অধিকার নিয়ে ঘোষণা করা ওয়াশিংটনই তাদের কংগ্রেসের গ্রহণের জন্য “সোপা” ও “পিপা” বিল এনেছে, যেখানে অনলাইন পাইরেসি ও কপিরাইট বাঁচানোর নামে, যে কোন সাইট ও তার মালিক কে ধ্বংস করা যাবে, আর তার জন্য সীমান্তের বাধাও কোন ব্যাপার নয়. এটা একরকমের বিশ্বময় পুলিশ সৃষ্টি করা. এরপরে যে কোন বিমান বন্দরে, সীমান্তে, সঙ্গের ইলেকট্রনিক যন্ত্র যে কোন অজুহাতে কেড়ে নেওয়া যাবে ও তার জন্য জবাবদিহির প্রয়োজন হবে না. ইউরোপেও এই রকমের আইন “অ্যাকটা” (অ্যান্টি কাউন্টারফিটিং ট্রেড এগ্রিমেন্ট)নামে নেওয়া হতে যাচ্ছে.

    এই ধরনের আইনের সমর্থনে অনেক বুদ্ধি প্রসূত সম্পত্তির মালিক কোম্পানী আজ এক জোট হয়েছে. একই সময়ে ইন্টারনেটের সাধারণ গ্রাহক ও বিরাট ইন্টারনেট কোম্পানী যেমন, গোগোল, টুইটার, উইকিপিডিয়া এই ধরনের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করছে. ইন্টারনেটের জনতার ক্ষোভের কারণ বুঝতে পারা যায়: নতুন আইন ব্যবহার করে প্রশাসন নকল খোঁজার নামে সমস্ত ট্রাফিক ও গ্রাহকদের কাজ নিয়ন্ত্রণ করবে – আর, বাস্তবে, ইন্টারনেটে সেন্সর জারী করবে. আর তখন কে এই প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করবে?

0    কিন্তু এই উদ্দাম ঘটনা স্রোত – স্রেফ খুবই পারিপার্শ্বিক সংঘাতের উদাহরণ, এই কথা বিশ্বাস করে প্রতিদ্বন্দ্বী গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই মাসলোভিচ মনে করেছেন যে, এই সব নতুন প্রক্রিয়ার মৌল গুলি – ইন্টারনেট কলোনী তৈরীর অংশ. বেশ কিছু বড় রাষ্ট্র দেখতে পেয়েছে যে, এই “কারও নয়” এলাকা খালি পড়ে রয়েছে – আর, নিজেদের তথাকথিত “গণতান্ত্রিক” ধান্ধা অনুযায়ী ঠিক করেছে এই এলাকাকে নিজেদের কলোনী বানাতে হবে, সেখানে নিজেদের আইন জারী করে. ইন্টারনেটের রসদ হল তথ্য – আর আজ তথ্য সোনা ও খনিজ তেলের চেয়েও দামী. এর জন্যই শুরু হয়েছে সত্যিকারের যুদ্ধ. কাদের আইন এখানে বেশী শক্তিশালী বলে প্রমাণিত হবে – যারা “আগে থেকেই” ইন্টারনেটে রয়েছে সেই সব লোকেদের, নাকি নতুন “কলোনী যারা বানাতে চায়” তাদের?