বিগত রবিবারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানী ঘোষণা করেছেন যে, পাকিস্তান সম্পূর্ণ ভাবে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে কূটনীতি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনাকেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে. আমরা একবিংশ শতকে নিজেদের যুদ্ধ করতে দিতে চাই না, - উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী.

    গিলানীর এই ঘোষণার কারণ হয়েছিল কাশ্মীরের সঙ্গে সহমত দিবস, যা পাকিস্তানে পালন করা হয়ে থাকে ১৯৯০ সাল থেকে. কাশ্মীরের সমস্যা – বিশ্বের রাজনীতিতে অন্যতম পুরনো হয়ে যাওয়া ও বিস্ফোরক সমস্যা. বিংশ শতাব্দীতে ভারত ও পাকিস্তান চারবার যুদ্ধ করেছে, তারমধ্যে তিনটি হয়েছে – কাশ্মীর সমস্যার কারণেই. নিয়মিত সন্ত্রাসবাদী হানা, সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সীমান্ত বরাবর গোলা গুলি বর্ষণ এই যুদ্ধ বিরতি কালীণ সময়ে ঘটেছে. এই সমস্ত বিরোধের বছর গুলিতে সর্বমোট নিহতের সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়েছে.

    পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা – ভাল সঙ্কেত, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার আগে. কিন্তু এর মানে কি ইসলামাবাদের কাজকর্মের ধারা পাল্টে গিয়েছে? এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল কিছু বিষয় লক্ষ্য করা, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “ভারত বা পাকিস্তানের কোন প্রশাসনই কোন দিনই কাস্মীরের সম্পূর্ণ অঞ্চল থেকে নিজেদের টানতে অস্বীকার করবে না, এর অর্থ তাদের কাছে আত্মহত্যার সমান. প্রধানমন্ত্রী গিলানী সব মিলিয়ে এই কথাই আবার সমর্থন করেছেন, এই বলে যে, পাকিস্তান আগে থেকেই তৈরী রয়েছে খুবই সক্রিয়ভাবে কাশ্মীরের লোকেদের মানসিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার জন্য. তাহলে কাশ্মীর সমস্যার শক্তি প্রয়োগ করে সমাধানের বিষয়ে ঘোষণা করে অস্বীকার করার অর্থ কি হল? সম্ভবতঃ, প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার অর্থ বিংশ শতাব্দীর তুলনায় একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত বাস্তবের প্রতিফলন. আর এখানে শুধু পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিপদের প্রসঙ্গই উঠছে না.

    পাকিস্তানের বহু বিষয়ে অবস্থান নরম করার অর্থ এই ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, বিগত বছর গুলিতে তারা নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী জোটকে হারিয়েছে. বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে, যে সময়ে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তখন প্রায় সব সময়েই তারা এক প্রচ্ছন্ন এবং কখনও খুবই প্রকট সাহায্য পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে. কিন্তু বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যে চিনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে কাজের উপযুক্ত ভর কেন্দ্র দেখতে পেয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই সক্রিয়ভাবে ঠিক করতে ব্যস্ত. পাকিস্তান আপাততঃ এশিয়ার রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরের বাইরে রয়েছে, যার ফলে আমেরিকা – পাকিস্তানের সম্পর্কেরও খুবই অবনতি হয়েছে”.

    এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে সামরিক বিরোধ পাকিস্তানের জন্য বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে, বলে মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    “আর তাই এই আলোচনা - বিতর্কিত সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায়. আর এমনকি তা দিয়ে শুরু করার কোনও দরকার নেই. বরং উল্টোটাই: যত দ্রুত সমাকলন প্রক্রিয়া শুরু হবে – দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে অথবা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, সেই রকমের যেমন, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ততটাই সহজ হবে ভবিষ্যতে এই সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা.

    ইউরোপের উদাহরণেই দেখতে পাওয়া যায়, ফ্রান্স ও জার্মানীর মধ্যে এলজাস ও লটারিঙ্গি নিয়ে শতাব্দী পার হয়ে আসা সমস্যা, যা বহু যুদ্ধের কারণও হয়েছে, তার মধ্যে বিশ্ব যুদ্ধও রয়েছে, তা বর্তমানে নেই. আজ এলজাসের রাজধানী স্ট্রাসবুর্গ ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের রাজধানী, আর ফ্রান্স ও জার্মানী – দুটি স্তম্ভ হয়েছে, যার উপরে ইউরোপীয় সঙ্ঘের ঐক্য দাঁড়িয়ে রয়েছে”.

    সুতরাং এমন তো হতেই পারে যে, আজকের ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকদের নাতি নাতনিরা আর মনে করতে পারবেই না কাশ্মীর সমস্যা কি ছিল.