বিশ্ব টেনিসের নক্ষত্রেরা ধর্মঘটের হুমকি দিচ্ছেন অথবা, খেলার সংজ্ঞা অনুযায়ী লক আউট করবেন বলছেন. কারণ, নিজেদের অধিকার নিয়ে এই সব কোটিপতি লোকেরা কেন লড়াই করতে যাচ্ছেন, তা সব মিলিয়ে খনি শ্রমিক, বিমান চালক বা শিক্ষকদের চেয়ে কোন অংশেই আলাদা নয়- কঠিন কাজ ও তার জন্য আয়, যা হিসেবে মিলছে না.

    আজকের দিনে টেনিস খেলোয়াড়েরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশী দামী খেলোয়াড়. এই রকম একজন যিনি শান্তি ভঙ্গ করেছেন, সেই স্পেনের টেনিস খেলোয়াড় রাফায়েল নাদালের ২০১১ সালে মোট পুরস্কার অর্থ পাওয়া হয়েছিল ৭৬ লক্ষ ডলার. তাঁরই পেশার আরেক সহকর্মী, যিনি এই বয়কট আন্দোলনের আয়োজক ব্রিটেনের অ্যান্ডি মারে অবশ্য কম আয় করেছেন, তাও সেটা দশ লক্ষের উপরেই. সেই সব খেলোয়াড়েরা, যাঁরা কোন বড় প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠতে পারেন না, তারাও গরীব নন. গত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন প্রতিযোগিতায়, যা চারটি সবচেয়ে মর্যাদাময় প্রতিযোগিতার একটি, তাতে প্রথম রাউণ্ডেই যারা হেরে বেরিয়ে গিয়েছেন, তারাও পেয়েছেন কুড়ি হাজার করে ডলার. আর এটা দেড় থেকে দুই ঘন্টা কাজের জন্য. সেই সব জিমন্যাস্ট বা ফিগার স্কেটিং যারা করে থাকেন, তারা প্রতিযোগিতায় সব চেয়ে শেষ পজিশনে থেকেও এত টাকা পেয়েছেন বলে গর্ব করতে পারেন না. আর এটাও সত্য যে, এই ধরনের খেলার খেলোয়াড়দের সারা বছরের আয় নাদাল কিম্বা মারের কাছাকাছি হতে পারে বলে মনে করা শক্ত. কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে টেনিস খেলোয়াড়দের মতো এত নিয়মিত কেউই খেলেন না. সবচেয়ে বেশী যারা টাকা পান – তাদের ১৮টি আবশ্যিক প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে হয়, যার মানে হল ৩২ থেকে ৩৪ সপ্তাহ খেলা. এই প্রতিযোগিতার রুটিন, যা খেলোয়াড়দের একেবারে নিঃশেষ করে ছাড়ে, তা কমানোর জন্যই খেলোয়াড়েরা আন্দোলন করছেন, ব্যাখ্যা করে বলেছেন রাশিয়ার টেনিস ফেডারেশনের ট্রেনার সভার সভাপতি গেন্নাদি ঝুকভ, তিনি বলেছেন:

    "এই ধরনের চাপ এত যে, তা অবশ্যম্ভাবী ভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী ও তৈরী হওয়া খেলোয়াড়দেরও আঘাত পেতে বাধ্য করে. আর নাদাল এর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে, ফেডেরার, জকোভিচ, রাশিয়ার তুরসুনভ, ইউঝনি কেউই বাদ যায় নি. অভিযোগ প্রতিযোগিতার রুটিনের ঘনত্ব নিয়ে, তা অস্বাভাবিক নয় আর তার ভিত্তিও আছে. আর খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের প্রতিও নজর দেওয়ার দাবীও যুক্তিসঙ্গত".

    কিন্তু প্রতিযোগিতার সংখ্যা কমানো, অথবা সঠিক করে বললে আবশ্যিক গুলির সংখ্যা কম করা হলে, তা অবধারিত ভাবেই এই প্রশ্নের আর্থিক দিকে প্রভাব ফেলবে. শুধু টেনিস খেলোয়াড়দের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টান পড়বে না, বরং প্রাথমিক ভাবে আয়োজকদেরই পড়বে, বলে মনে করে গেন্নাদি ঝুকভ বলেছেন:

    "টেনিস খেলোয়াড়েরা বছরে দ্বিগুণ কম প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে চান. দাবী ঠিকই, কিন্তু যদি তা পালন করা হয়, তবে সেই সমস্ত সংস্থার ব্যবসায়িক স্বার্থ, যারা এই সব টুর্নামেন্টের স্পনসর ও প্রাইজ মানির যোগান দেন, তাদের ক্ষতি হতে পারে. প্রতিযোগিতা নেই – ভাল মাপের পুরস্কারের অর্থও নেই".

    খেলোয়াড়েরা এই পরিস্থিতি থেকে বেরোবার পথ পেয়েছে এর মধ্যেই. খেলার সংখ্যা কমানোর সঙ্গে তারা আহ্বান করেছে পুরস্কারের অর্থকেও সত্ভাবেই ভাগ করে দেওয়ার. এখন তারা আয়োজকদের যে লাভ হয় তার থেকে শতকরা ১১ শতাংশ পায়, আর তারা এবারে দাবী করেছে এই হার বাড়ানোর, কিন্তু আয়োজকেরা এই পথে কি হাঁটতে রাজী হবেন?

    আপাততঃ বিশ্বের টেনিস খেলোয়াড়েরা দুটি ভাগে বিভক্ত. একদল, প্রাক্তন প্রথম দশ জনের মধ্যে একজন হয়ে থাকা জার্মানীর খেলোয়াড় মিখাইল শ্টিখ এর মতোই মনে করেন যে, খেলোয়াড়েরা কম খেলে বেশী রোজগার করতে চান. তিনি বলেছেন, "খেলোয়াড়েরা ভুলে যাচ্ছেন যে, এই প্রতিযোগিতা গুলিই তাদের খাওয়ার পয়সা দেয়, তাদের কাজ আছে, আর যদি তা তারা নিজেরাই বেছে নিয়ে থাকেন, তবে তার সঙ্গে যে কষ্ট রয়েছে, সেটাও বাছতে হবে".

    রুশ টেনিস ফেডারেশনের প্রধান শামিল তারপিশ্যেভ উল্টো ভাবেন, তিনি খেলোয়াড়দের পক্ষে ও মনে করেন তাদের দাবী যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায্য. কিন্তু তা অর্জন করা যেতে পারে শুধু ঐক্যের মাধ্যমেই. আর সেই ধরনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে. ১৯৭৩ সালে তারা যুগোস্লাভিয়ার খেলোয়াড় নিক পিলিচ কে অনুপযুক্ত ঘোষণার প্রতিবাদে একজোট হয়ে উইম্বলডনের মতো প্রতিযোগিতাকে বয়কট করেছিল. লন্ডনের সবচেয়ে মর্যাদাময় প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বাছাই করা খেলোয়াড়দের মধ্যে ৭৯ জন পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় যোগ দেন নি. এই খেলার পরিচালক বর্গ বাধ্য হয়েছিলেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে.

    আজও কি ঐক্য হবে? অন্ততঃ খেলোয়াড়দের মধ্যে হাল্কা আনাগোনা শুরু হয়েছে. রজার ফেডেরার মনে করেন যে, ধর্মঘট খুবই বিপজ্জনক কথা ও তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত্. সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড় বলেছেন যে, "এটা কারও জন্যেই কিছু ভাল নিয়ে আসে না, আমরা এটা দেখতে পেয়েছি অন্যান্য ধরনের খেলার মধ্যেই, যেমন উত্তর আমেরিকাতে – বাস্কেটবল ও আইস হকি খেলার প্রতিযোগিতায়". নিজেদের হয়ে কোনও কথা আপাততঃ মহিলা টেনিস খেলোয়াড়েরাও বলেন নি. তাদের মহিলাদের এটা এখনও দরকার নেই – মনে করেন ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড় ইভান লিউবিচিচ. "আমরা যখন নিজেদেরটা পাবো, তখন তারা স্রেফ আসবে, আর নিজেদের জন্য অর্ধেক নিয়ে যাবে", উল্লেখ করেছেন খেলোয়াড়.

    নিজেদের দাবী আদায় করতে টেনিস খেলোয়াড়েরা পরিকল্পনা করেছে খুবই আসন্ন সময়ের মধ্যেই, মার্চ মাস অবধি তারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরী করে, নিজেদের দাবী দাওয়া আইন সঙ্গত ভাবে তৈরী করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ান ওয়েলসের টুর্নামেন্টের আগেই ঘোষণা করবে বলে ঠিক করেছে.