মঙ্গলবারে চিনের ঝেনমিন ঝিবাও (জনগনের দৈনিক) পত্রিকার ইংরাজী অন লাইন ভার্সনের পাতায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারী ও প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানির সঙ্গে সাক্ষাত্কার প্রকাশ করেছে. যদিও এই দুটি সাক্ষাত্কারে একেবারে অত্যাধুনিক কোন মত দেখতে পাওয়া যায় নি, তাও মন দিয়ে পড়লে টের পাওয়া যায় যে বাস্তবে পাকিস্তানের বর্তমানের দুই রাষ্ট্র নেতাই স্বীকার করেছেন যে, তাঁরা বিশ্ব ভূ- রাজনৈতিক খেলায় চিনের পক্ষেই বাজী ফেলেছেন.

    পাক রাষ্ট্রপতি বলেছেন যে, চিনের সঙ্গে তাঁদের বর্তমানের সহযোগিতা সমস্ত উন্নতিশীল দেশের পক্ষেই আদর্শ হতে পারে. এখন, যখন নতুন সম্ভাবনার উদয় হচ্ছে, নতুন মাত্রা ও নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি তৈরী হচ্ছে, তখন পাকিস্তান ও চিন একে অপরের প্রতি নতুন করে ভরসা খুঁজে পেয়েছে. চিন ও পাকিস্তান এক সঙ্গে কাজ করার কারণ আরও বেশী করেই চোখে পড়ছে ও তা ভারীও হয়েছে. আমরা একে অপরের জন্য প্রয়োজনীয়, পাকিস্তান চিনের উন্নতিতে প্রথম প্রশংসা করবে.

    এর পরে জারদারী উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তান চিনের আঞ্চলিক রাজনীতিতে ও বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রথম স্থান দখলের লড়াইতে শক্তি বর্ধনের অনুঘটকের কাজই করবে, আর ভবিষ্যতে চিন, যা এখন নতুন জাপানে পরিনত হচ্ছে, তা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিনত হবে. রাষ্ট্রপতির কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন প্রধানমন্ত্রী গিলানি, তিনি বলেছেন যে, চিন- এটা আমাদের রাজনীতির এক ভিত্তি প্রস্তর... চিন সর্ব ক্ষণের বন্ধু দেশ, যা সময়ের পরীক্ষাতেই প্রমাণিত হয়েছে.

    পাকিস্তান যে এই অঞ্চলে চিনের রাজনীতির বাহক হয়েছে, তা বহু বিশ্লেষকই আগেও বলেছেন. কিন্তু কয়েকদিন আগেও পাকিস্তানের নেতৃত্ব এটা এত বেশী করে দেখাতেন না, কারণ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বর্তমানের সবচেয়ে প্রভাব শালী বিশ্ব শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরনো মৈত্রী না হারানো.

    আমাদের সমীক্ষক বরিস ভলখোনস্কির মতে, উপরোক্ত কারণ বর্তমানে আর চলছে না. আগে যদি পাকিস্তানে মৌলবাদীরাই শুধু মার্কিন নিন্দা করতো, তবে বিগত সময়ে উপর্যুপরি বোমারু ড্রোন হামলায় পাকিস্তানের আফগানিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত গণ মৃত্যু ও তা নিয়ে দেশ জোড়া প্রতিবাদ, সরকারকেও বাধ্য করেছে কড়া অবস্থান নিতে. যদি এই বিষয়ে দেশের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা জেনেরাল পারভেজ মুশারফকে সরিয়ে পাকিস্তানের সিংহাসনে জারদারীকে বসিয়ে মার্কিন সরকার চেয়েও থাকে যে, এবার থেকে সবই ইচ্ছা সুখে করা যাবে, তা কিন্তু আদতে বাস্তবে হয় নি. সিংহাসনের স্বাদ পেয়ে জারদারী তার প্রাক্তন পৃষ্ঠপোষক দের প্রয়োজন মতো কাজ করতে রাজী হন নি. তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চাশা ও জনতার চোখে ভাল থাকার চেষ্টার ফলে বর্তমানে পাক- মার্কিন সম্পর্ককে কেউই গুরুত্ব দিয়ে বিচার করতে তৈরী নন, এমনকি সেই দেশ গুলিতেও নয়.

    এই সব ধারণার পিছনে রয়েছে যুক্তি হিসাবে পাকিস্তানে কয়েকদিন আগেই মার্কিন রাষ্ট্রপতির পাক- আফগান বিষয়ে বিশেষ প্রতিনিধি মার্ক গ্রসম্যানের সফর বানচাল করে দেওয়া ও তারই সঙ্গে ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়কে জটিল করে তোলা. কারণ আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ বহুদিন আগে থেকেই রয়েছে, তাও হয়েছিল সেই মার্কিন সাহায্যেই ও সোভিয়েত বিরোধীতার বছর গুলিতে. এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের সৃষ্ট কবন্ধের কাছেই বাধ্য, কারণ নিজেদের প্রয়োজনে সৃষ্ট মিত্র আদতে কখনোই সত্য বন্ধুতে পরিণত হয় না, এই সত্যকে অস্বীকারের প্রচেষ্টাই কাল হয়েছে. চিনও বর্তমানে একই ভুল করতে চলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধিতায় গিয়ে পাকিস্তানকে মৈত্রীর নামে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসাবে থাকার বিষয়ে সায় দিয়ে. পাকিস্তান নিজেদের অক্ষ আগামী কিছুদিনের জন্য পাল্টে ফেলেছে: এখন তারা নিজেদের চৈনিক রাজনীতির পরিবাহক হিসাবেই দেখতে চায়, তাদের স্বার্থকেই নিজের স্বার্থ বলে ঘোষণা করে. চিন কি পুরনো অভিজ্ঞতা দেখে সাবধান হবে?