ভারত দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে আঞ্চলিক বিধানসভা নির্বাচন পর্যায়ে পা রেখেছে. সোমবারে পাঞ্জাব ও উত্তরাখণ্ড রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, আর এক সপ্তাহ বাদে ৮ই ফেব্রুয়ারী সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হবে. এই সব নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য গুলির নিজেদের জন্যই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এই গুলিকে বলা যেতে পারে ২০১৪ সালে হতে যাওয়া সারা দেশ জুড়ে লোকসভা নির্বাচনের এক শেষ মহড়া.

    বিশেষ মনোযোগ আটকে রয়েছে খুব একটা বেশী নয়, মাত্র ১ কোটি লোকের রাজ্য উত্তরাখণ্ডের নির্বাচনের উপরে, যেটি আয়নার মতোই ভারতের পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখায়. এখানেই প্রাক্ নির্বাচনী প্রচার হয়েছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রকৃতির. যথেষ্ট হবে, শুধু এই কথা মনে করলেই য়ে, এখানে সভায় বক্তৃতা করতে এসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারন সম্পাদক ও নেতা রাহুল গান্ধীকে জুতো দেখতে হয়েছিল, যা তার দিকে জনৈক যুবক বক্তৃতার সময়েই ছুঁড়ে মেরেছিল. তেমনই হয়েছিল অণ্ণা হাজারের সমর্থকের বেলায়. গত ২০০৭ সালের নির্বাচনের সময়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এখানে প্রশাসনিক দলের ক্ষমতা হারিয়েছিল ও নিজেদের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কাছে পরাজিত হয়েছিল. রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কির মতে, এই রাজ্যে নির্বাচন, অন্য সব কিছু বাদ দিলেও, সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিতে বাধ্য: কে ও কোন দল গত বছরের সারা সময় ধরে সারা ভারত জোড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের বলি হতে চলেছে আর ২০১৪ সালের ভোটের আগে পর্যন্ত পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজক থাকবে কি না?

    "অণ্ণা হাজারে গত বছরে যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা আসলে দেশের শাসক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোটের বিরুদ্ধেই ছিল, আর বিজেপি, সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে চেষ্টা করেছিল এই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নিতে, তা নিজেদের প্রাক্ নির্বাচনী লক্ষ্যে ব্যবহার করতে. কিন্তু উত্তরাখণ্ড, যেখানে বিজেপি শাসনে রয়েছে, আর জাতীয় কংগ্রেস বিরোধী পক্ষে, পরিস্থিতি একেবারেই উল্টো. শেষমেষ, ভারতে দুর্নীতি – এতটাই সর্বস্তরে বিস্তৃত ঘটনা যে, কোন দলই এই ক্ষেত্রে নিজেকে অবধ্য বলে ভাবতে পারে না. তাই বিজেপি দলকেও উত্তরাখণ্ড রাজ্যে আক্রমণ ছেড়ে নিজেদেরই আত্মরক্ষার পথ ধরতে হয়েছে. আর এমনকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বদলাতে হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে. সুতরাং এখানে ভূমিকা পাল্টেছে. আর যদি এখন জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষে এই রাজ্যে নিজেদের পুরনো ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়. তাহলে এটাকে দলের ও নেতৃত্বের জন্য ভাল লক্ষণ বলেই দেখা হবে: অর্থাত্ অণ্ণা হাজারের আন্দোলন শুধু দেশের ক্ষমতাসীন দলকেই আঘাত করে নি. আর এটা দেশে ২০১৪ সালের পরেও বর্তমানের সরকারকে ক্ষমতায় থাকার পথ খুলে দেবে."

    উত্তরাখণ্ডে কংগ্রেসের বিজয়, যদি তা ঘটে, তবে তা খুবই শক্তিশালী গতি এনে দেবে ভারতের সবচেয়ে ঘন জন বসতি পূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে নির্বাচনে এই দলের ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে. এই রাজ্যে আজ বেশ কয়েক দশক ধরেই কংগ্রেস দল স্থানীয় রাজনীতির বাহির মহলে বসে রয়েছে, এমনকি সেই দিকে না দেখলেও যে, এই রাজ্য থেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের বেশ কিছু ব্যক্তি এবং স্বয়ং গান্ধী পরিবারের সদস্যরাও দেশের লোকসভাতে এখানের কিছু কেন্দ্র থেকেই নির্বাচিত হয়ে থাকেন. তাই ভলখোনস্কি বলছেন:

    "উত্তর প্রদেশের নির্বাচন শুধু সেই প্রশ্নেরই উত্তর দেবে না যে, কোন দল সারা দেশের মধ্যে বিজয়ী হওয়ার ক্ষমতা রাখে, বরং সেই প্রশ্নেরও উত্তর যোগাবে, যা আজ ভারতে প্রায় সকলেই করে থাকেন: বর্তমানের গান্ধী গোষ্ঠীর দাবী কতখানি ভিত্তি সঙ্গত যে, তাদের প্রধান আশা – রাহুল গান্ধী – তার পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবেন? বেশীর ভাগ পর্যবেক্ষকই যে বিষয়ে নির্দেশ করেছেন, তা হল উত্তর প্রদেশ রাজ্যে জাতীয় কংগ্রেসের বাজে ফলাফল বাস্তবে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেই কবর দিতে পারে".

    এটা খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছে তার বিরোধীরা. তাই সম্ভবতঃ বিজেপি দলের সাধারন সম্পাদক রবি শঙ্কর প্রসাদ, রাহুল গান্ধীকে প্রস্তাব করেছেন যে, তিনি যেন এখনই প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন, তাহলে লোকে বুঝবে, তিনি কতখানি দেশ চালাতে সক্ষম. প্রসাদ, বোঝাই য়াচ্ছে, চাইছেন যে, যেহেতু জাতীয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বিগত কয়েক মাস ধরে খালি কমেছে, রাহুল আজ দেশের প্রশাসনের ভার নেওয়ার জন্য সক্ষম নন – এমনকি তা কোন ব্যক্তিগত গুণের অভাবের জন্যই নয়, শুধু পরিস্থিতির কারণেই.

    এখন প্রশ্ন হল: বিজেপির নেতা কি একটু তাড়াহুড়ো করে ফেললেন না, আর উত্তরাখণ্ডের নির্বাচনী ফলাফল দেখা অবধি দেরী করলে কি ঠিক হতো না? উত্তর আমরা খুব শীঘ্রই জানতে পারবো.