ভারতে সরকারের কয়েকটি বড় সামাজিক সাইট ও ইন্টারনেট কোম্পানীকে আদালতে টেনে আনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিতর্কের শেষ হচ্ছে না. এর মধ্যে গোগোল ফেসবুক রয়েছে, আর সরকার চাইছে ব্লগ সেন্সর করতে, যা প্রায়ই খুব অসভ্য ও অপমানজনক লেখায় ভর্তি হচ্ছে. এই মামলা শুরু হতে চলেছে ১৩ই মার্চ আদালতে. কিন্তু এখনই স্ক্যাণ্ডাল আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছেছে: বৃহস্পতিবারে দাভোস শহরের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ দিতে গিয়ে গোগোল কোম্পানীর প্রতিনিধিরা ভারতের নিজেদের সেন্সর করার সিদ্ধান্তকে আবার করে বিবেচনা করতে আহ্বান করেছেন.

    "ইন্টারনেটে সেন্সর করা সম্ভব নয়", - এই কথা ঘোষণা করেছেন গোগোল কোম্পানীর এক নেতৃস্থানীয় কর্মী মুকেশ অরোরা. "সারা বিশ্বের সমস্ত লোকেদের নিজেদের আত্ম প্রকাশের ইচ্ছাকে বা অধিকারকে সেন্সর করা সম্ভব নয়. আপনারা যে চান না সারা বিশ্বের ইন্টারনেটে সেন্সর করতে. ইন্টারনেটের জন্য কোনও সীমান্ত নেই". আরও যোগ করেছেন: "ভারতের অর্থনীতির জন্যই ইন্টারনেটে সেন্সর করার প্রচেষ্টা খারাপ পরিণতি আনতে পারে". এই প্রসঙ্গে বহু পর্যবেক্ষকই ইন্টারনেটে সেন্সরের প্রচেষ্টা কিছুদিন আগে স্যাটানিক ভার্সেস বইয়ের লেখক সলমন রুশদীর ভারত সফরে জয়পুরের কবি লেখক সম্মেলনে যাওয়া বরবাদ হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন. এই সিদ্ধান্ত ভারতের সরকারের থেকে চাপ ছাড়া নেওয়া হয় নি, যারা ভয় পেয়েছেন মুসলমানদের তরফ থেকে সামাজিক বিস্ফোরণের. একই সঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষক ঘোষণা করেছেন যে, ভারতে চিনের মতই ইন্টারনেটে সেন্সর করার চেষ্টা হচ্ছে, আর তা খুবই খারাপ ব্যাপার. ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনে বাধ্য হতে হয়েছে. তথ্য সম্প্রচার ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী মিলিন্দ দেওড়া ঘোষণা করেছেন: "আমরা একেবারেই সংবাদ মাধ্যমের উপরে সেন্সর করার কথা বলছি না, আমরা এটা করতে পারি না আর করবো না". মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন যে, "ভারত শুধু নিজেদের দেশের নাগরিকদের জন্য সেই অধিকার অর্জন করতে চাইছে, যাতে ইন্টারনেটে দেওয়া কোন না কোন বিষয় বস্তু থেকে ভারতীয় সমাজের আলাদা কোন গোষ্ঠী বা সমষ্টি অথবা ধর্মীয় দল নিজেদের অপমানিত বোধ না করেন ও যা ভারতের রাষ্ট্রীয় আইনের পরিপন্থী, সেগুলিকে সাইট থেকে ছেঁটে দেওয়া হয়".

    এই সব ইতিহাস ভাবতে বাধ্য করে ইন্টারনেট কোম্পানী, সরকার ও গ্রাহকের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে, তাই রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "একই প্রশ্ন নিয়মিত উঠছে, কোথায় বাক্ স্বাধীনতা ও স্বাধীন ভাবে নিজের মত প্রকাশের মধ্যে সীমানা, একদিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় দলের মধ্যে নানা রকমের সংবেদনশীল ব্যাপার আর অন্যদিকে ব্যক্তি ও সংবাদ মাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব শীলতা?

    গত বছরের ঘটনা – উইকিলিক্স নিয়ে স্ক্যাণ্ডাল, আরব বসন্ত ইত্যাদি দেখিয়েছে যে, আজ সারা বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেট ও বেশ কিছু সামাজিক সাইট খুবই শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছে, তারা স্রেফ জাতীয় সরকারের জন্য সমস্যা তৈরী করতে পারে বলেই নয়, বরং তাদের পতন ঘটাতে পারে. ইজিপ্ট ও টিউনিশিয়ার ঘটনাতো শুধুই টুইটার বিপ্লব বলে নাম পায় নি.

    এই নতুন বাস্তবের জন্য প্রয়োজন একেবারেই নতুন পদক্ষেপ, যখন কোন আলাদা করে লেখকের সম্বন্ধে কথা উঠছে, যেমন সলমন রুশদী বা চিনের লেখক আই ভেইভে অথবা আরও অনেক চিনের নির্বাসিত লেখকদের সম্বন্ধে, যাদের যা হোক করে চুপ করিয়ে রাখা যাচ্ছে, যদিও প্রত্যেক বছরের সঙ্গেই এই ধরনের ব্যবস্থা বিশ্ব সমাজের সমালোচনার সম্মুখীণ হচ্ছে.

    কিন্তু গোগোল, টুইটার বা ফেসবুকের সঙ্গে কি করা যেতে পারে? এদের প্রত্যেকেরই গ্রাহক বহু সহস্র লক্ষ লোক, যাদের মধ্যে প্রত্যেকেই পারে (অনেক সময়েই অনামী থেকে)এমন কিছু লিখতে যা যে কোন লোককে অপমান করতে পারে. প্রত্যেককে নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই সম্ভব নয়. বাস্তবে, এই ধরনের লেখার লেখকেরা এক কথায় সম্মিলিত অজ্ঞানতার পরিচয় দিয়ে থাকেন. তাদের মধ্যে এক আধ জনকে চেপে ধরা যেতে পারে, যারা বিশেষ করে ব্লগ বানিয়ে খ্যাতি কুড়োতে চান, তাদের জন্য আলাদা করে ফিল্টার বানানো যেতে পারে বিশেষ অপমান জনক বা অসভ্য ভাষা সংশোধনের জন্য. কিন্তু সব মিলিয়ে সামাজিক সাইটের বিরুদ্ধে যাওয়া – এটা একই রকমের ব্যাপার, যেমন, মাটিতে প্রচুর ভিতের স্তম্ভ লাগানো, যাতে ভূমিকম্প থেকে রেহাই পাওয়া যায়, অথবা ত্সুনামির বিরুদ্ধে ছাতা হাতে এগিয়ে যাওয়ার মতো".

আর তাই সেই সব সরকারকে, যাদের ব্লগ স্ফিয়ারের কোন না কোন কনটেন্ট পছন্দ হচ্ছে না, খুব সম্ভবতঃ নিজেদের দিকেই পাশ থেকে দেখা দরকার বলে ভলখোনস্কি মনে করেছেন. কারণ সামাজিক সাইট – এটা স্রেফ আয়না, তা বাঁকা আয়নাও হতে পারে, যাতে সবই উদ্ভট ও বিকলাঙ্গ বলে মনে হয়, কিন্তু তাও মনে রাখতে হবে যে, এটা নিছক প্রতিফলন – আর তা সব সময়েই পরবর্তী ব্যাপার.