মানব সভ্যতার শেষ জাগতিক ভান্ডার বলে মনে করা হয় আন্টার্কটিকা বা দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে. এই খানের জমি আবিষ্কার করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে. রুশ সমুদ্র অভিযাত্রী লাজারেভ ও বেল্লিনসহাউজেন এই কাজ করেছিলেন. ১৯৫৬ সালে সেখানে প্রথম সোভিয়েত মেরু স্টেশন "মিরনী" খোলা হয়েছিল. তার পর থেকে রাশিয়া ষষ্ঠ মহাদেশের গবেষণায় নেতৃস্থানীয় জায়গা দখল করে রেখেছে, যেখানে বর্তমানে কাজ করছে ১১টি দেশের ৬০ খানি ঘাঁটি.

    মনে হয়, আন্টার্কটিকা এলাকায় বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়, চারিদিকে শুধু বরফ আর ঠাণ্ডা এমনই যে, গরমে তা মাইনাস ২০ ও শীতে মাইনাস ৮০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড. ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মত হাওয়ার জোর আর যাবতীয় সৌর রশ্মি সমেত প্রবল রৌদ্র. তা স্বত্ত্বেও এই ভয়ঙ্কর এলাকা মানুষকে টানে. রাশিয়ার "বেল্লিনসহাউজেন" স্টেশনে ২০০৭ সালে "পবিত্র ত্রয়ীর" গির্জায় প্রথম বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছিল. দক্ষিণ মেরুতে এমনকি শিশুর জন্মও হয়েছে: প্রথম বাচ্চা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে. কিন্তু অবশ্যই এখানের বেশীর ভাগ লোকই মেরু স্টেশনের বিজ্ঞানী. রাশিয়ার এখানে সাতটি স্টেশন রয়েছে, পাঁচটি স্থায়ী, দুটি ঋতু নির্ভর. সেখানে কাজ করছে, দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জাহাজ – "অ্যাকাডেমিক ফিওদরভ" ও "অ্যাকাডেমিক কারপিনস্কি". রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া, কারণ ষষ্ঠ মহাদেশ বিশ্বের আবহাওয়ায় বিশাল প্রভাব ফেলে, এই কথা উল্লেখ করে আর্কটিক ও আন্টার্কটিকা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভাইস ডিরেক্টর আলেকজান্ডার দানিলভ বলেছেন:

    "সারা বিশ্বের উষ্ণায়নের ঝুঁকি রয়েছে. এই সম্পর্কে আন্টার্কটিকা বিশ্বের জীব জগতের উপরে নির্দিষ্ট রকমের বিপদ ডেকে আনতে পারে, কারণ এখানের বরফ গলতে শুরু করলে মহাসমুদ্রের জলের স্তর উঁচু হবে, তার অর্থ হল হল্যান্ডের মতো বহু দেশ জলের তলায় চলে যাবে, তার মধ্যে রাশিয়ার অংশও রয়েছে. এটা খুবই গুরুতর বিপদ".

    বর্তমানের আন্টার্কটিকা সংক্রান্ত পরিকল্পনার মধ্যে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা বরফের নীচে থাকা "ভস্তক" হ্রদের জল অবধি পৌঁছনোর কাজ করছেন, এর জন্য প্রায় ৪০০০ মিটার বরফ খুঁড়তে হচ্ছে, এখন বাকী মাত্র মিটার ২০ ও তা সম্ভবতঃ এই বছরেই শেষ করা যাবে. এটা মঙ্গল গ্রহে মানুষের যাওয়ার মতই বড় মানব সভ্যতার আবিষ্কার হবে. এই হ্রদ বৈকালের অর্ধেক কিন্তু এর নীচে বা জলে একবার পৌঁছনো গেলেই হতে পারে যে, একেবারেই অন্য ধরনের প্রাণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যা আগে কখনও জানা ছিল না. এই হ্রদ আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে বিগত ৪২০ হাজার বছরে পৃথিবীর আবহাওয়াতে কি ধরনের পরিবর্তন হয়েছে – এই কথা উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর ভূগোল ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির কতলিয়াকভ বলেছেন:

    "এটা চারটে আবহাওয়ার বৃত্ত, যখন পরিস্থিতি ছিল হিম যুগের, আর তার পরে মধ্য হিম যুগের. বর্তমানে আমরা রয়েছি মধ্য হিম যুগে, আর আগের যুগের পৃথিবীর মাটির তাপমাত্রা থেকে এখনকার তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রী কম হয়েছে. তার মধ্যে আবার বিশ্বে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা দ্বিগুণ বেশী হয়েছে, যা তখন ছিল না. এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফল, যা বলে দেয় যে, মানব সমাজের ভাগ্য ভাল এই কারণে, যে আমাদের কাজকর্মে বিশ্বের প্রধান আবহাওয়ার প্রক্রিয়াতে কোনও পরিবর্তন হয় নি. প্রকৃতির যন্ত্র আগের মতই কাজ করছে, তা ভালই ভারসাম্য রেখে চলে".

    এটা মানব সমাজকে একটা আশা দেয়. তার ওপরে মেরুতে কাজ করা বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের দৌলতে জানা গিয়েছে যে, আর্কটিকের তুলনায় আন্টার্কটিকায় বরফ জমা কমছে না, বরং তা উল্টে বাড়ছে, অর্থাত্ দক্ষিণ মেরু উত্তর মেরুর সঙ্গে ভারসাম্য রেখেই রয়েছে.