ভারতের রাজনীতির জন্য কয়েকটি মুখ্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চক্রের আবর্তন বৃদ্ধি হয়েছে. এই ক্ষেত্রে শুধু পশ্চিমের প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের থেকে সবচেয়ে ঘৃণ্য নমুনা গুলিরই প্রতিরূপ তৈরী হচ্ছে না, বরং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের জাতীয় বিশেষত্ব.

    সোমবারে যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারন সম্পাদক রাহুল গান্ধী উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুন শহরের উপকণ্ঠে এক জন সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন জনৈক যুবক( জানা গিয়েছে তার শুধু নাম – কুলদীপ) তার দিকে জুতো নিক্ষেপ করেছে. কুলদীপ রাহুলের গায়ে জুতো ছুঁড়ে মারতে পারেন নি – মিটার দশেক তফাতে সেটা পড়েছে. কিন্তু মজুদ পুলিশ ও সুরক্ষা কর্মীরা তত্ক্ষণাত কুলদীপকে ধরে গ্রেপ্তার করেছে.

    এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে রাহুল গান্ধীর আত্মসংযমের কথা. তিনি তাঁর বক্তব্যের সূত্র হারিয়ে ফেলেন নি ও বলেছেন: "যদি কেউ মনে করে যে, একটা জুতো ছুঁড়লেই আমি ভয় পাবো ও দৌড়ে পালাতে বাধ্য হব, তবে এই ধরনের লোকেরা ভুল ভেবেছে. আরও ছোঁড়া হোক!" কিন্তু এই ঘটনা অনেক সুদূর প্রসারী পরিনাম দিতে পারে – আর তা শুধু বর্তমানের প্রচার পর্বের জন্যই নয়, বরং রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও হতে পারে, যাঁকে অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন, ভারতের আগামী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, এই রকমের মন্তব্য করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "আরব দুনিয়ার মতোই ভারতে মাথায় জুতো ছুঁড়ে মারা দেখা হয়ে থাকে ঘোর অপমান হিসাবে. তার ওপরে, পায়ের উপরে পা তুলে বসে থাকা (যা পশ্চিমে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার) মনে করা হয় একেবারেই অসম্মান দেখানো. এই ব্যাপারটাই লিবিয়ার নিহত নেতা গাদ্দাফি খুবই বেশী বার ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, পায়ের চটি ঝুলন্ত অবস্থায় কোন না কোন পশ্চিমের নেতার সামনে রেখে, যারা হয় বুঝতে পারেন নি যে এই ভাবে গাদ্দাফি তাদের প্রতি নিজের তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছেন অথবা স্রেফ কূটনৈতিক কারণেই ভদ্র ভাবে হাস্যময় ভাব বজায় রেখেছেন.

    যদি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের দেরাদুনের এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই করা ঘোষণা গুলি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, তারা এই ঘটনাকে চেপে দিতে চাইছেন না আর এর মধ্যেই ঘটনার জন্য নিজেদের সমস্ত বিরোধীদেরই দায়ী করেছেন আর তাদের মধ্যে বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টিও রয়েছে, যারা বর্তমানে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কর্তৃত্বে".

    ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সরকারি প্রতিনিধি রশিদ আলভি ঘোষণা করেছেন: "কিছু সময় ধরে বিজেপি ঘোষণা চালিয়ে যাচ্ছে যে, লোকে এর পরে রাস্তায় নামবে ও গৃহযুদ্ধ শুরু হবে. এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞান হীণ ঘোষণা এই রকমের কাজকে উত্সাহিত করে. আমি জানি না এর পেছনে কে বা কারা রয়েছে, তবে রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের উচিত্ খুবই সাবধানে কথা বেছে বলা ও এই ধরনের ঘোষণা থেকে বিরত হওয়া".

    রাহুল গান্ধী ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একেবারেই প্রথম জুতো খাওয়া নেতা নন. ২০১০ সালে আগষ্ট মাসে এই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা. গত বছরের নভেম্বর মাসে একই রকমের আক্রমণের সামনে পড়েছিলেন রাহুল গান্ধীর খুড়তুতো ভাই ও বিজেপি দলের এক উদীয়মান নেতা বরুণ গান্ধী. আর রাহুল গান্ধীর উপরে আক্রমণের মাত্র দু দিন আগেই সেই দেরাদুন শহরেই জনৈক যুবক দুর্নীতি বিরোধী নেতা অণ্ণা হাজারের দলের এক কর্মী, যিনি একানে সবা করছিলেন, তার উপরে ছুঁড়েছিল.

    এই জুতো ছোঁড়া ব্যাপারটা একটা গণ রোগে পরিনত হয়েছে ২০০৮ সালে জর্জ বুশ জুনিয়রের উপরে ইরাকে সম্মেলনে সাংবাদিক মুন্তাজার আল- জৈদি জুতো ছোঁড়ার পর থেকেই. তিনিও তখন লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেন নি, গ্রেপ্তার হয়ে কয়েক মাস জেলেও বন্দী ছিলেন. কিন্তু আরব দুনিয়াতে তিনি বীর বলে খ্যাতি পেয়েছেন. আর বুশের জন্য এই ঘটনা খুবই কটূক্তি ও ব্যঙ্গের কারণ হয়েছিল.

    বর্তমানের ঘটনা নিয়ে যা বলা যায়, তা হল ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত রাজনৈতিক বংশ নেহরু – গান্ধী পরিবার আক্রান্ত. এর পরে এই বিষয় নিয়ে বেশী আলোচনা করলে, তা মনে তো হয় না যে, রাহুল গান্ধীর ইমেজ বৃদ্ধি করবে. বরং উল্টোটাই হবে – লোকে তাড়াতাড়িই ভুলে যাবে এই ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি, বরং মনে থেকে যাবে রাহুলকে এমন এক ব্যক্তি বলে, যার দিকে জুতো ছোঁড়া হয়েছিল.