গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক স্ক্যাণ্ডাল শুরু হয়েছে গয়নার ডিজাইনে ঐতিহ্যময় হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রতীক স্বস্তিক চিহ্ন নিয়ে. নিউইয়র্কের ব্রুকলিন এলাকায় একটি ছোট গয়নার দোকানে মালকানি কিম ইউন সুক স্বস্তিক চিহ্ন সমেত কানের দুল বিক্রীর জন্য শো কেসে রেখেছিলেন. প্রায় তক্ষুণি ম্যানহাটানের পৌর সভার প্রধান স্কট স্ট্রিঙ্গার দোকানের মালকানিকে এই কানের দুল বিক্রীর জন্য রাখা শো কেস থেকে উঠিয়ে নিতে নির্দেশ দেন, সেগুলি নাকি ইহুদি বিদ্বেষের নমুনা. একটি সাক্ষাত্কারে স্ট্রিঙ্গার বলেছেন, "আমাদের সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে ঘৃণ্য প্রতীক, আর তা যে কোন সভ্য মানুষের জন্যই একটা অপমান, এটা কোনও ফ্যাশন নয়".

শ্রীমতী কিম এই ধরনের বক্তব্যের বিষয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করেছেন, তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের গয়না ভারতে তৈরী হয়েছে আর সেগুলি ঐতিহ্য অনুযায়ী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক সহ গহনা, তা দিয়ে কাউকে রাগানোর উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না. কিন্তু তাকে শেষ অবধি এই গহনা বিক্রীর ডালা থেকে সরাতেই হয়েছে.

ইন্টারনেটে এই ইতিহাস অনেক পরস্পর বিরোধী অর্থের উদ্রেক করেছে. পশ্চিমের ও প্রাথমিক ভাবে ইহুদী সমাজ এর মধ্যে দেখতে পেয়েছে নিউ ইয়র্কে স্বস্তিক চিহ্নের গয়না বিক্রী হচ্ছে, এটা বহু লক্ষ ইহুদী যাঁরা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতির অবমাননা. একই সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধরাও এই ঘটনার মধ্যে তাঁদের পবিত্র প্রতীকের অবমাননা দেখতে পেয়েছেন, তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে, যা সম্বন্ধে আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনে উল্লেখ রয়েছে.

আসলে এই সমস্ত ব্যাপারই আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, আধুনিক বিশ্বায়িত পৃথিবীতে এখনও খুবই কঠোর সভ্যতা গুলির মধ্যে প্রাচীর রয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের ও জাতির প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়া স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

"স্বস্তিক চিহ্ন প্রতীক হল কল্যাণের (এটাই সংস্কৃত কথা স্বস্তিক এর অর্থ), চিরন্তন জীবনী শক্তির আর তা জার্মানীর নাত্সী শাসকরা প্রথমে নিজেদের দলের ও তার পরে সরকারি প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করার বহু সহস্র বছর আগে থেকেই ছিল. সবচেয়ে পুরনো স্বস্তিক চিহ্নের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের হরপ্পা সভ্যতার সময়ে. আমাদের কালে ভারতে বহু মন্দিরে ও বাড়ীর দরজায় এই চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় – আর কেউই এর মধ্যে অন্য কোন সভ্যতা বা সংস্কৃতির জন্য হুমকি দেখতে পান নি".

স্বস্তিক চিহ্ন কল্যাণের প্রতীক হিসাবে আরও বহু দেশের লোকে ব্যবহার করেছেন. আমেরিকাতে এটা ছিল বহু স্থানীয় প্রজাতির চিহ্ন, তার ওপরে বিংশ শতকের শুরুতে যখন বহু ইউরোপীয় লোকের ধারণায় ইন্দো- ইউরোপীয় সভ্যতা (আর্য) সভ্যতা ইউরো এশিয়ার লোকেদের একই উত্স থেকে উদ্ভব বলে হয়েছিল, তখন এই প্রতীক পশ্চিমেও জনপ্রিয় হয়েছিল, আর তা জার্মানীর নাত্সীদের এই চিহ্ন ব্যবহারের অনেক আগেই. যেমন, কানাডাতে এই নামের শহর রয়েছে.

কিন্তু এটা অনেক সময়েই ঘটেছে যে, সহস্র বছরের ইতিহাস বিংশ শতকের মাঝামাঝি একটি দশকের সামান্য বেশী সময়েই পাতা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে. তাই ইহুদীরা নিউ ইয়র্কে যে প্রতিবাদ জানিয়েছে, তা খুবই ব্যাখ্যা করার যোগ্য বলে মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি:

"নিউইয়র্কের একটা এলাকা ব্রুকলিন, যেখানে ইহুদী লোকেদের সংখ্যা অনেকটাই বেশী. আবার একই সঙ্গে এটা এমন এলাকা, যেখানে নিয়মিত নানা রকমের ধ্বংসাত্মক কাজ কারবার হয়ে থাকে, যা করা হয় ইহুদী বিদ্বেষী দেওয়াল লিখন ও প্রতীক অঙ্কণ করে. তাই এখানে বিক্রীর জন্য শো কেস থেকে গয়না হঠিয়ে দেওয়াটা ঠিক কাজই হয়েছে.

অন্য ব্যাপার হল যে, এটা করা হয়েছে কড়া নির্দেশ অনুসারে ও তার সঙ্গে এমন ঘোষণা করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, স্ট্রিঙ্গার এর মানেই জানেন না. কারণ তিনি বাস্তবে সমস্ত হিন্দু ও বৌদ্ধকে সভ্য মানুষের সমগোত্রীয় বলে নামই দিতে চান না.

শেষমেশ নাত্সী জার্মানীর সেনাদের বকলসে স্বস্তিক চিহ্ন ছাড়াও লেখা থাকতো "ঈশ্বর সাথে রয়েছেন". এই ভিত্তি দিয়ে নিউ ইয়র্কের পৌর সভা প্রধান নিশ্চয়ই সমস্ত গির্জা বন্ধ করবেন না, অথবা ধর্মীয় বই বিক্রী বন্ধ করে দেবেন না"!

0বোধহয় অনেকের চেয়ে এই বিষয় নিয়ে এক ব্লগ লেখক ভাল মন্তব্য করেছেন, যিনি বিরোধী দুই পক্ষকেই একে অপরের প্রতি সহ্য শক্তি প্রদর্শন করতে উপদেশ দিয়েছেন: "এটা যদি কারোর কাছে অপমানের ঠেকে, তবে ভাল হয় এটাকে এড়িয়ে গেল, এমনিতেই বিশ্বে প্রচুর বিরোধ জমা হয়ে গেছে".