গত শুক্রবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র দপ্তর পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে খুবই আচমকা ঘোষণা করেছে. টুইটার সাইটে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে রাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি প্রতিনিধি ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেলুচিস্থানে বর্তমানের হিংসা, বিশেষত খুন, অপহরণ ও অন্যান্য মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন.

    যদিও শ্রীমতী ন্যুল্যান্ড উভয় পক্ষকেই সংযত হয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি আলোচনার পথে অন্তরায় হওয়া সমস্ত সমস্যাকে মেটানোর বিষয়ে নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশে খুবই সতর্ক ছিলেন, তাও এই ঘোষণা বিনা বিতর্কেই বিশ্বে বেলুচিস্থানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সমর্থন বলেই মনে করা হয়েছে.

    পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও বেলুচিস্থানের অধিবাসীদের সম্পর্কের ইতিহাস খুবই জটিল. ১৯৪৭ সালে অনেক বেলুচ লোকই মোটেও খুশী হতে পারেন নি, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তে তাদের পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার কারণে. ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে বেলুচিস্থানে একাধিকবার গণ অভ্যুত্থানও হয়েছিল. আর আজকের বেলুচিস্থান দেশের উত্তর পূর্বে প্রজাতি অধ্যুষিত এলাকার মতোই পাকিস্তানের একটি সবচেয়ে কম শান্ত এলাকা. এই এলাকায় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সক্রিয়তা খুবই বেশী, আর এটাও সত্য যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রায়ই খুব কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে থাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজকর্ম কমানোর জন্য. এই ক্ষেত্রে যদিও বেলুচিস্থান সোনা, তামা, খনিজ তেল ও গ্যাসের সঞ্চয়ে খুবই সমৃদ্ধ ভাণ্ডারের অধিকারী, তাও পাকিস্তানে এই এলাকা সবচেয়ে দরিদ্র ও অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত অঞ্চল.

    এটা হওয়া স্বত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্থানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংগ্রামের অনেকটাই বিশ্ব সমাজের জানার বাইরে রয়ে গিয়েছে. তাহলে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নিজের ঘোষণা এখনই করলেন? এখানে ব্যাপারটা শ্রীমতী ন্যুল্যান্ড ও বেলুচিস্থানের অধিবাসীদের মধ্যে কোন বিশেষ প্রীতির প্রশ্ন নয়, এই কথা বলে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "আসল কারণ কয়েকটা. প্রথমতঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দুই দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে নিম্ন স্তরের হয়েছে. তাই ওয়াশিংটনের স্ট্র্যাটেজি তৈরী করিয়ে লোকেরা এই দেশের জন্য আলাদা করে নতুন পরিকল্পনা তৈরী করছে, যাতে নিজেদের প্রভাব আবার বহাল করা যায়. আর যদি সেই সমস্ত বছর গুলিতে, যখন পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই নির্ভরযোগ্য জোটের অংশ ছিল, তখন তার টুকরো হয়ে যাওয়া ওয়াশিংটনের মূল নীতির অংশ নাও হয়ে থাকে (যদিও কিছু আলাদা করা বিশ্লেষক এই বিষয়ে তখনও মন্তব্য করতেন), তবে আজকের দিনে তা খুবই বাস্তব".

    দ্বিতীয়তঃ, সমস্যা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের আফগানিস্তানে হচ্ছে ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে মাঝেমাঝেই সেখানে রসদ যোগানের জন্য দক্ষিণের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে হচ্ছে, তা বাধ্য করেছে অন্য পথ খুঁজতে. আর যদি স্বাধীন বেলুচিস্থানের ধারণা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ও পরে মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকিস্তান ও রাশিয়াকে বাদ দিয়েই যাওয়ার পথ করে দেবে.

    বেলুচিস্থানের সমস্যার প্রতি মনোযোগ দেওয়াকে ইরানের প্রতিও চাপ সৃষ্টি করার আরও একটি লিভার হতে পারে, এই রকম মনে করে ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "ইংরেজ কলোনীর সময় থেকেই বেলুচ লোকেরা পারস্য ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়া লোকের মতো বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়েছিল. বেলুচিস্থানের স্বাধীনতার সংগ্রামের সমর্থন তীর্যকভাবে ইরানে বিচ্ছিন্নতাবাদী মাথা চাড়াতে সাহায্য করা হয়ে যাবে, যা বর্তমানের পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধাই করে দেবে, যখন আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্ক খোলাখুলি যুদ্ধের পরিস্থিতিতেই রয়েছে.

    আর সর্বশেষ, স্ট্র্যাটেজিক ভাবে পাকিস্তানে বেলুচিস্থানের জন্য সমর্থন এমন একটা পদক্ষেপ, যা এই আরব সমুদ্র এলাকায় চিনের প্রভাব বিস্তারের পথে অন্তরায় সৃষ্টির জন্য করা হতে পারে. কারণ হল ইরানের সীমান্ত থেকে সামান্য দূরে বেলুচিস্থানে গাধার শহর রয়েছে, যেখানে চিনের সক্রিয় আর্থিক ও প্রযুক্তি সাহায্য দিয়ে গভীর সমুদ্রের বন্দর তৈরী করা হচ্ছে. পাকিস্তানের জন্য এই বন্দরের নির্মাণ শেষ করে, সমস্ত রকমের কাঠামো দিয়ে তা প্রস্তুত করতে পারা এক বিশাল লাফ হবে এই অশান্ত ও অর্থনৈতিক ভাবে পেছিয়ে থাকা রাজ্যের উন্নতিতে, যা অনেকটাই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিতে সাহায্য করবে.

    আর চিনের জন্য – এটা সোজা রাস্তা হবে আজকের দিনের ভূ রাজনৈতিক কারণে মুখ্য অঞ্চলে সমস্ত মাল পরিবহন ও সামরিক নৌবাহিনীর চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য".

    আপাততঃ খুবই সন্দেহজনক ঠেকছে যে আসন্ন ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্থান আলাদা করার নীতি বাস্তবায়িত করতে যাবে কি না তাই নিয়ে. কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রদেশের এমনিতেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তারা একই সাথে অনেক গুলি ভূ রাজনৈতিক লক্ষ্য সাধন করতেই পারে.