যারা সারা বছর ধরেই উষ্ণ আবহাওয়াতে থাকেন, সেই সব মানুষের পক্ষে খুবই কঠিন অনুভব করা যে, বিশ্বে এমন অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে বছরের বেশ কয়েক মাস ধরে মাটি ঢাকা থাকে বরফে, নদী যায় বরফে ঢেকে, তাপমাত্রা শূণ্য ডিগ্রীর অনেক নীচে থাকে ও লোককে গায়ে লোমের ওভারকোট ও মাথায় লোমের কানঢাকা টুপি পরে তবে বাইরে বেরোতে হয়. রাশিয়া – বিশাল দেশ ও যদিও দেশের নানা জায়গার আবহাওয়া নানা রকমের, তাও প্রায় সমস্ত জায়গা জুড়েই শীত কয়েক মাসের জন্য তার অধিকার নিয়ে এখানে প্রত্যেক বছরেই হাজির হয়. রাশিয়ার শীতের জন্য সাধারন সঙ্গী হল তুহিন হিমেল পরিবেশ, আর রুশ লোকেরা বহু কাল ধরেই তাকে শরীর মজবুত ও সুস্থ করার জন্য ব্যবহার করতে শিখেছেন.

       রাশিয়ার উত্তরের দিকের মানুষেরা, যেখানে শীত সবচেয়ে কড়া, একেবারে শিশু বয়স থেকেই ঠাণ্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখেন. সেখানে বেঁচে থাকতে গেলে এটা অবশ্য কর্তব্য. যেমন ইয়াকুত (এক উত্তরের প্রজাতি) মানুষেরা সদ্যোজাত শিশুকে দিনে রাতে কয়েকবার করে বরফ দিয়ে গা ঘষে, ঠান্ডা জলে স্নান করায়. এই ঐতিহ্য আমাদের কাছে এসেছে আমাদের বহু যুগ আগের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে.

       শুধু উত্তরের লোকেরাই নন, বরং রাশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরাও আজও প্রাচীন রুশ শরীর মজবুত করার ঐতিহ্য মেনে চলেন: দীর্ঘ সময় ধরে খালি গায়ে ঠাণ্ডায় থাকা, ঠাণ্ডা জল গায়ে মাথায় ঢালা, খালি পায়ে বরফের উপর দিয়ে হাঁটা.

       কিছু শরীর তাজা রাখার উপায় অবশ্য চিকিত্সকদের কাছে তর্কের বিষয়. যেমন বরফ গলা জলে স্নান. রাশিয়াতে একটা ঐতিহ্য রয়েছে – বরফের নীচে গর্ত খুঁড়ে সেই জলে ডুব দেওয়া (নদী বা পুকুরে), তা সাধারণত করা হয় অর্থোডক্স খ্রীষ্টান ধর্ম মেনে পবিত্র দীক্ষার দিনের উত্সবে. মনে করা হয় যে, এই দিনে যে ঠাণ্ডা জলে ডুব দেবে, সে শুধু তার পাপই ধুয়ে ফেলবে না, বরং সুস্থও হয়ে যাবে. এই নিয়ে প্রশ্ন আজ বহুদিন ধরেই বিশাল তর্কের সূচনা করেছে. তা স্বত্ত্বেও, ১৯শে জানুয়ারী বহু শত লোক এই প্রাচীন নিয়ম পালন করে থাকেন. আর শরীর মজবুত করার এই উপায়ের সমর্থক সবচেয়ে উদ্যোগী লোকেরা অন্যান্য শীতের দিনেও এই রকম কাজ করে থাকেন.

       আরও একটা প্রাচীন ঐতিহ্য – রুশ হামামে স্নান. কাঠ দিয়ে তৈরী ছোট বাড়ীর ভিতরের প্রধান জায়গা হল বাষ্প ঘর, সেখানে শরীর ধোওয়ার কাজ করা হয়. আগুণে গনগনে করা পাথরের উপরে জল ছিটিয়ে বাষ্প করা হয়, কখনও তাতে কয়েক ফোঁটা গন্ধ তেলও দেওয়া হয়, যা শুধু ভালই নয়, উপকারীও বটে. স্নান ঘরে গা মালিশের জন্য রুশীরা ব্যবহার করেন বিভিন্ন গাছের সপত্র শাখা (প্রধানতঃ ইউক্যালিপটাস জাতের), তা দিয়ে একে অপরের সর্বাঙ্গ ঝাড়তে থাকেন, অন্য কেউ দেখলে এটাকে বর্বরতা মনে করতে পারেন, কিন্তু এই পিটুনির ফলে গায়ের ময়লা দারুণ ভাল করে সাফ হয়ে যায় ও শরীর ঝর্ঝরে হয়ে যায়, সারা গায়ে গরম বাষ্পে ও ডালের আঘাতে রক্ত ফুটে চামড়া লাল হয়ে ওঠার পরে এই স্নান ঘর থেকে বেরিয়ে ঠাণ্ডা জল বা জমানো বরফ কুঁচির মধ্যে ডুব দেওয়া হয়ে থাকে. পরে গা ধুয়ে শুদ্ধ হয়ে বেরিয়ে এলে মনে হয় এর চেয়ে আরামের কিছু হতেই পারে না. এটা শুধু ভাল নয়, শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক ব্যাপার. ঠাণ্ডার দিনে রুশী হামামে ( রুশী ভাষায় একে বানিয়া বলা হয়ে থাকে) স্নান একটা জাতীয় ঐতিহ্যের বিষয়.

       তবে অবশ্য সমস্ত রাশিয়ার লোকই যে ঠাণ্ডার সময়ে কড়া রকমের শরীর সুস্থ রাখার উপায় পছন্দ করেন, তা বলা ঠিক হবে না. তাও খোলা হাওয়াতে বেড়ানো, আইস স্কেটিং ও স্কি করতে যাওয়া – এই সব শীত কালের মজা এই দেশে খুবই জনপ্রিয় ও শরীরের জন্যও তা ভাল.