পারস্য উপসাগরে পরিস্থিতি ক্রমশঃই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে. ইরান সতর্ক করে দেওয়া সত্বেও আমেরিকা ঘোষণা করেছে, যে ঐ এলাকায় তার সামরিক নৌবাহিনী আরও জোরদার করবে. বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয়পক্ষ একে অন্যকে চোখ রাঙাচ্ছে, আর বাস্তবে সত্যিকারের যুদ্ধের কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছে.

    গতকাল হোরমুঝ উপসাগরে ইরানের ‘ওয়েলাত-৯০’ নামক সামরিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হয়েছে. ঐ উপসাগর দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার জন্য সমুদ্রপথে ৪০ শতাংশ খনিজ তেল রপ্তানী করা হয়. ইরান ঐ উপসাগর অবরোধ করার হুমকি দেওয়ার সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে. ইরানি সামরিক প্রশিক্ষণের এলাকায় বিমানবাহী জাহাজ ‘জন স্টেনিসে’র নেতৃত্বে একটা বড় নৌবহর পাঠানো হয়েছে. তার প্রত্যুত্তরে ইরানের সেনাধ্যক্ষ আতাওল্লা সালেহি আমেরিকা যদি ঐ এলাকায় তার নৌবহর মোতায়েন করতেই থাকে, তাহলে আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারন সৃস্টি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন. তিনি আরও এই হুমকি দিয়েছেন, যে যেকোনো আঘাত সামলানোর সামর্থ্য তার দেশের আছে এবং কোনো জুলুম তারা সহ্য করবে না. উল্টোদিকে আমেরিকা বলছে, যে ঐ এলাকায় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তারক্ষার জন্য তারা সামরিক অভিযান থেকে বিরত হবে না. আপাততঃ উভয়পক্ষ পেশীপ্রদর্শন করছে, কারন, সত্যি কথা বলতে কি, কারোরই যুদ্ধের প্রয়োজন নেই. প্রাচ্যতত্ত্ববিদ বরিস দলগোভ সেরকম অভিমতই পোষণ করেন.

      ইরানের আমেরিকার সাথে সংঘাতের প্রয়োজন নেই, কারন প্রথমতঃ আমেরিকাকে রোখার মতো সামরিক সামর্থ্য নেই, দ্বিতীয়তঃ আমেরিকার ইস্রায়েলের মতো শক্তিশালী শরিক আছে. আমেরিকার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, যে ওখানে শাসনক্ষমতায় যেমন ইস্রায়েলের স্বার্থাণ্বেষী গোষ্ঠী আছে, তেমনই আছে তারা, যারা ঐ এলাকায় যুদ্ধ বাঁধাতে চায় না. এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তের উপর সবকিছু নির্ভর করছে. আপাততঃ ইরানের বিরূদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার কোনো পরিকল্পনা আমেরিকার শীর্ষ নেতৃবৃন্দের নেই.

      সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল, এই যে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় সামান্যতম কোনো সামরিক অভিযান শুরু হলেও তা কয়েকদিনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে. ঐ এলাকার প্রায় সব দেশই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে. আর সেটা হবে ইরানের বিরূদ্ধে সবার যুদ্ধ নয়. রুশী বিজ্ঞান এ্যাকাডেমির সিনিয়র ফেলো লিদিয়া কুলাগিনার মতে ইরানেরও একাধিক দোসর আছে.

     ঐ এলাকার সমৃদ্ধ দেশগুলি অবশ্যই কোনো যুদ্ধ চায় না. কারন ছোটখাটো কোনো সামরিক অভিযান হলেও ইরান তার উত্তর দেবে, যার আঘাত প্রতিবেশী দেশগুলির উপর পড়বে. পারস্য উপসাগরীয় এলাকার দেশগুলির ইরানের প্রতি সম্পর্ক ভালো নয়. প্রথমতঃ, এটা শিয়া-সুন্নী বিরোধ, দ্বিতীয়তঃ ইরানের পারমানবিক নীতি. ইরান সেইজন্যেই প্রতিবেশী দেশগুলির বিরক্তির কারন. কিন্তু তুরস্ক বা লেবাননের মতো একসারি দেশ যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের বিরূদ্ধে যাবে না. ঐ সব দেশ ইরানকে সমর্থন করবে, এমনকি সাহায্য পর্যন্ত করবে.

     তবে ইরানের মুখ্য সরিক হচ্ছে সিরিয়া. ঐ দুই দেশেরই শীর্ষনেতৃত্ব পাশ্চাত্যের কাছে চক্ষুশূল. নিকট প্রাচ্যে আমেরিকার সমস্ত কার্যকলাপের উদ্দেশ্য হল মাহমুদ আহমাদিনিজাদ ও বাশার আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা. তবে এখনো পর্যন্ত কোনো দেশেই আমেরিকা লিবিয়ার চিত্রনাট্য বাস্তবায়িত করতে পারছে না. তার কারন জাতিসংঘ এবং চীন ও রাশিয়ার মতো বড় দেশ ইরান বা সিরিয়ার বিরূদ্ধে যেকোনো রকম সামরিক অভিযানের বিপক্ষে মতপ্রকাশ করছে. উদাহরণস্বরূপ, চীন বারাক ওবামা কতৃক স্বাক্ষরিত ইরানের বিরূদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারী করার তীব্র নিন্দা করেছে. আর রাশিয়া উভয় দেশের সমস্যার একান্তভাবেই কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে.