ফুকুসিমা পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে বিপর্যয় হওয়া স্বত্ত্বেও জাপান ভারতবর্ষকে নিজেদের পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরীর প্রযুক্তি বিক্রী করতে চেয়েছে. এই প্রশ্ন নিয়েও দিল্লী শহরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইওসিহিকো নোডা ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছেন. মঙ্গলবারে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সরকারি সফরে ভারতে গিয়েছেন. কিছু বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    মার্চ মাসে ফুকুসিমা পারমানবিক কেন্দ্রে বিপর্যয়ের পরে জাপান ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারমানবিক প্রযুক্তি রপ্তানী সংক্রান্ত কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছিল. তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁদের দেশ পারমানবিক শক্তি নির্ভরতা কমাতে চায়. জাপানেও ফুকুসিমা সহ বেশ কয়েকটি পারমানবিক শক্তি উত্পাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল.

    কিন্তু হেমন্তেই লক্ষ্য পথ পাল্টে গিয়েছে. দেশের ভিতরে যদিও পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক সম্পর্ক রয়েছে. কিন্তু অন্য দেশকে পারমানবিক শক্তি ক্ষেত্রে নিজেদের পরিষেবা প্রস্তাব করতে জাপান আবার সক্রিয় হয়েছে. এর প্রথম দেশ হয়েছে ভারতবর্ষ. সেপ্টেম্বরে জাপানের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান কোইতিরো গেম্বা সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর ভারতীয় সহকর্মী এস. এম. কৃষ্ণের সঙ্গে পারমানবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন. এবারে এই বিষয় ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিষয়ক সহযোগিতা সম্বন্ধে আলোচনার বিষয় হয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পক্ষ থেকে জাপানের পারমানবিক শক্তি প্রযুক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন শেষ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় নি.

    এই সবই খুব আশ্চর্য বলে মনে হতে পারে, বিশেষ করে কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, যা ভারতের দক্ষিণে তামিলনাডু রাজ্যে রাশিয়ার সহযোগিতায় তৈরী করা হয়েছে. এই কেন্দ্রের প্রথম দুটি বাস্তবে তৈরী হয়ে যাওয়া রিয়্যাক্টর সময়মতো চালু করতে পারা যায় নি স্থানীয় জনতার প্রতিবাদের জন্য, যারা নাকি ভয় পেয়েছেন নিজেদের ঘরের কাছে ফুকুসিমা পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রে মতো বিপর্যয় হতে পারে বলে. এই একই কারণে কুদানকুলামের তৃতীয় ও চতুর্থ রিয়্যাক্টর সংক্রান্ত ইতিমধ্যেই স্বীকৃত চুক্তিও স্বাক্ষর করা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে. এই বিষয়ে মন্তব্য করে জ্বালানী ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ডিরেক্টর আন্তন খ্লোপকভ বলেছেন:

    "আমার মতে, সেই সমস্ত দেরী, যা চলে যাওয়া বছরে দেখতে পাওয়া গিয়েছে রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মীয়মান ভারতীয় পারমানবিক কেন্দ্রে, তা প্রাথমিক ভাবে দেখা উচিত্ জাপানের পারমানবিক কেন্দ্রের বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতেই, ভারতের পারমানবিক শক্তি বিকাশের উদ্যোগ থেকে সম্ভাব্য হঠে যাওয়া হিসাবে নয়. এই দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের গতি প্রকৃতি দেখে ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখে ভারতের অদূর ভবিষ্যতে পারমানবিক শক্তির বিকাশ ভিন্ন অন্য কোনও পথ আছে বলে মনে হয় না. তাই কোন রকমের দেরী হলেও, যা গত বছরে করা হয়েছে, আমি আগের মতই আশা নিয়ে মনে করি যে, ভারতের পারমানবিক শক্তি উত্পাদন বিকাশ করবেই".

    ফুকুসিমা পারমানবিক কেন্দ্র তৈরীর সময়ে চল্লিশ বছর আগে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হত, তার থেকে বর্তমানের আধুনিক প্রযুক্তি বহু এগিয়ে গিয়েছে. রাশিয়া প্রযুক্তি ফুকুসিমার মতো বিপর্যয় হওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ভাবেই নাকচ করেছে. অংশতঃ এই ধরনের রিয়্যাক্টরে টারবাইনের জন্য যে বাষ্প ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে পারমানবিক জ্বালানী ঠাণ্ডা করার জলের কোনও প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাই নেই, তাই বিকীরণ ছড়িয়ে পড়াও অসম্ভব. রিয়্যাক্টর ঢেকে রাখা নিরাপত্তা বলয় এমন ভাবে তৈরী যে, এমনকি একটি বিমান ভেঙে পড়লেও ভয়ের কিছুই নেই. তাছাড়া কুদানকুলামের রিয়্যাক্টর ব্লকের নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়েছে সক্রিয় ও প্রতিক্রিয়াশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করেই, তা আবার বহু রকমের পরিমাপ নেওয়া যন্ত্র পাতি দিয়েও করা হয়েছে, যাতে যে কোন রকমের সম্ভাব্য যান্ত্রিক গোলযোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায় ও তত্ক্ষণাত ব্যবস্থা নেওয়া যায়.

    ভারতের যেহেতু পারমানবিক শক্তি বিষয়ে উন্নতি করা ছাড়া অন্য পথ নেই, তাই ভারতীয় প্রশাসনের জাপানের সঙ্গেও এই বিষয়ে আলোচনা প্রমাণ করে দিচ্ছে তাদের দৃঢ় মনোভাব, তারই সঙ্গে মনে পড়ে যে, ভারতীয় তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী বছরের শুরুতেই কুদানকুলাম থেকে প্রাথমিক শক্তি সরবরাহ চালু হবে.