বৃহস্পতিবারে ভারত সরকার দেশের লোকসভায় শেষ অবধি দুর্নীতি নিরোধের দায়িত্ব সংক্রান্ত দপ্তরের আইন বা লোকপাল বিল পেশ করেছে তা নিয়ে আলোচনার জন্য. এই ভাবে দেখলে মনে করা যেতে পারে যে, এই আইন নিয়ে চল্লিশ বছরেরও বেশী সময়ের ইতিহাস ও নয় মাস ধরে চলা সক্রিয় আন্দোলন, যা অণ্ণা হাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তা বোধহয় যুক্তিগ্রাহ্য ভাবেই শেষ হতে চলেছে.

    সরকার বেশীর ভাগ দাবীই মেনে নিয়েছেন, যা এই আইনের স্বপক্ষে আন্দোলনকারী মানুষেরা চেয়েছিলেন. অংশতঃ, রাজী হয়েছেন দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে দেশের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের আইনের আওতায় না থাকার সুবিধা হঠিয়ে নিতে, তাদের মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রীও রয়েছেন.

    মনে হতেই পারে যে, এবারে শান্ত হওয়া যেতে পারে. কিন্তু অণ্ণা হাজারে ও তাঁকে সমর্থন করা বিরোধী দলগুলি এর মধ্যেই সেই মর্মে বিবৃতি দিয়েছে যে, লোকসভায় আলোচনার জন্য যে বিল আনা হয়েছে তা তাদের সন্তুষ্ট করে নি. তাঁরা যে ধরনের প্রতিবাদ করেছেন, তা এই রকমের

    প্রথমতঃ, দুর্নীতি মোকাবিলার জন্য এই নিয়ন্ত্রণ পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া প্রধানতঃ রয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের হাতে.

    দ্বিতীয়তঃ, এই দপ্তরের অধীনে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো থাকছে না, আর তার মানে হল, অণ্ণা হাজারে ও তার দলের লোকেদের কথামতো, নিয়ন্ত্রণ পরিষদের কর্ণধারের হাতে বাস্তবিক কোন ক্ষমতা থাকছে না, যা দিয়ে দুর্নীতি সম্বন্ধে তদন্ত করা সম্ভব হয়.

    তৃতীয়তঃ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ পরিষদের কর্ণধারের শুধু সরকার বা সরকারি কর্মচারীদের সম্বন্ধেই তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকছে না, বরং থাকছে বেসরকারি অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুলি সম্বন্ধেও. আর এটা, তাদের মনে হয়েছে, পরিষদের কাজকর্মের লক্ষ্যই অনির্দিষ্ট করে দিচ্ছে.

    কিছু বিরোধী দল আরও অনেক দূরে এগিয়ে গিয়েছে, তারা ঘোষণা করেছে যে, আইনের প্রস্তুতি করা হয়েছে রাস্তার গণতন্ত্রের চাপে পড়ে তাড়াহুড়ো করে, যা বাস্তবে ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই নষ্ট করেছে আর এমনকি তাকে স্বৈরাচারের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে.

    সমস্ত শোরগোল, যা ভারতের বিরোধী পক্ষ তুলেছে, তা একটা চিন্তার শুরু করে যে, আসলে এখন প্রশ্ন এই নয় যে, দুর্নীতি নিরোধে প্রস্তাবিত আইন কার্যকরী অস্ত্র হবে কি না, বরং ধান্ধা সম্পূর্ণ অন্য, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "অণ্ণা হাজারের শুরু করা আন্দোলন বাস্তবেই প্রসারিত ভাবে যারা আগে কখনও রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশ নেন নি সেই জনগনের সমর্থন পেয়েছিল. এই তরঙ্গে রাস্তার মানব মিছিলের গণতান্ত্রিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকার ফেলে দিতে চেয়েছিল বিরোধী পক্ষ. ভারতবর্ষে ক্ষমতাসীন ইউ পি এ সরকারের জনপ্রিয়তা খুবই কমে গিয়েছিল, যদি এখনই নির্বাচন করা সম্ভব হতো, তাহলে কংগ্রেস দলের নেতৃত্বে এই প্রশাসনকে নির্বাচনে হারিয়ে অন্য রাজনৈতিক শক্তিকে এগিয়ে দেওয়া সম্ভব হত.

    কিন্তু সারা দেশ জোড়া নির্বাচনে হতে এখনও দুই বছর দেরী, আর অন্তর্বর্তী নির্বাচন করানোর ক্ষমতা বিরোধী দলের হয়ে ওঠে নি. আর সম্ভবতঃ, এখন প্রশাসনের হাতেই আবার তুরুপের তাস উঠেছে. আর এটা বিরোধী পক্ষের কোন সুবিধা করে দিচ্ছে না, যাদের ইচ্ছা হয়েছিল এই প্রশাসন বিরোধী আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতার অলিন্দে হাত বদল করে ফেলার, অন্ততঃ আর কিছু না করতে পারলেও আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এই প্রশাসন বিমুখ মনোভাব বজায় রাখতে".

    আর এখন, আনন্দের সঙ্গে দুর্নীতি বিরোধী আইনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোর বদলে, যার জন্য তাদের আগে নাকি ঘুম হচ্ছিল না, তারা এখন যে কোন রকমের ধান্ধা খুঁজছে, যাতে এটা নেওয়া সম্ভব না হয়, এই রকমই ভেবেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ.

    অণ্ণা হাজারে এর মধ্যেই আইনের খসড়া দেখে বলেছেন তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নখদন্তহীণ, আর তাই নিজের সমর্থকদের ডাক দিয়েছেন জেল ভরো আন্দোলনে যোগ দেওয়া জন্য, এই ভাবেই এক সময়ে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন করেছিলেন. নিজের সম্বন্ধে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, জেলে বসে অনশন সত্যাগ্রহ করবেন.

    এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা এই বিষয়ে নয় যে, দুর্নীতি নিরোধের জন্য লোকপাল বিল নেওয়া হবে কি না. বরং সমস্যা হল কারা এই বিল কেন্দ্র করে খবরের যুদ্ধে জয়ী হয়, - মনে করেন ভলখোনস্কি. প্রশাসন দেশের ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হবে কি না যে, তাদের আনা আইন যার অপেক্ষা ছিল সেই আইনটি, নাকি বিরোধী পক্ষ আইনের খামতি দেখিয়ে বোঝাতে পারবে যে প্রশাসন যা বলছে তা মিথ্যা? স্রেফ জনতার চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে. আর সেই যুদ্ধে, যারা জয়ী হবে, তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করবে ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত, অন্ততঃ আগামী পাঁচ দশ বছরের জন্য তো বটেই.