২০১০ সালে উদয় হওয়া উইকিলিক্স সাইট ২০১১ সালে কেলেঙ্কারির এক অন্যতম উত্স হয়েছে. কিছু দেশে এই সাইটের কাজে সরকারি কাঠামোর পক্ষ থেকে খুবই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যারা চেষ্টা করেছে ইন্টারনেটের উপরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তৈরী করার ও একই ধরনের প্রকল্প যাতে আর না হয় তা দেখার. উইকিলিক্স সাইটের স্রষ্টা ও তাদের প্রধান তথ্য সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে মামলা সমাজে খুবই তীক্ষ্ণ ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে.

    বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, উইকিলিক্স সাইটের উদয় হওয়া আধুনিক ইন্টারনেটের এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে. সাধারন গ্রাহক, আর প্রধান হল প্রশাসন গুলিও বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেটের জালকে শুধু খেলার, যোগাযোগের বা তথ্যের উত্স হিসাবেই দেখছেন না, বরং সামাজিক মতামতের উপরে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম অস্ত্র হিসাবেই দেখছেন. উইকিলিক্স ও সেই ধরনের সাইট সৃষ্টি হওয়ার পরে থেকে বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেট জালের প্রধান চরিত্র এখন শুধু "স্বাধীনতাই" নয়, বরং "সততা" হয়েছে, - এই কথা মনে করে "গ্রোটেক" নামের কোম্পানীর ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ভ্লাসভ বলেছেন:

    "এটা একেবারেই চরম মুক্ত অবস্থার প্রকাশ, আর ইন্টারনেট – সব মিলিয়ে এই জন্যই রয়েছে, যাতে যা জানা সম্ভব, তাই প্রকাশ করা যেতে পারে. আগে এটা ছিল শুধু ছাপা প্রকাশনার পক্ষে সম্ভব, বর্তমানে করদাতা ও নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য প্রহরী কুকুরের কাজের দায়িত্ব যাচ্ছে ইন্টারনেটের উপরে, তার মধ্যে সেই সমস্ত সাইটও রয়েছে যেমন, "উইকিলিক্স"".

    সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা সম্বন্ধেও এই সাইট দৃষ্টিকোণ পাল্টে দিয়েছে. অনেক দিন পর্যন্ত হ্যাকার সংক্রান্ত শোনা কথা রূপকথার আকার নিয়েছিল, যা নাকি বৈদ্যুতিন তথ্য ভাণ্ডারের প্রধান অন্তরায়. কিন্তু উইকিলিক্স সাইটের ক্ষেত্রে – প্রধান কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত তথ্য কোন নাম গোত্র হীণ তথ্য ভাণ্ডার লুঠেরা করে নি, করেছে আমেরিকার সেনা বাহিনীর এক সাধারন সেনা. ব্র্যাডলি ম্যানিং, পেন্টাগনের তথ্যের গোপন ভাণ্ডারে প্রবেশের অযাচিত সুযোগ পেয়ে, বহু লক্ষ দলিলের অনুলিপি করতে পেরেছিল ও তা উইকিলিক্স সংস্থার কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিল. হ্যাকারেরা কখনোই এত বেশী সংখ্যক তথ্য এক সঙ্গে যোগাড় করতে পারতো না বলে জোর দিয়ে মনে করে আলেকজান্ডার ভ্লাসভ বলেছেন:

    "এই সাইটের প্রকাশ সমস্ত পেশাদার লোকেদের প্রধান তাত্ত্বিক ধারণাকেই সমর্থন করেছে, যে কোন রকমের তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাতেই প্রধান ফাঁস হয়ে যাওয়া কোন বাইরে থেকে ভেঙে ঢোকার ফলে হয় না, বরং ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ার ফলেই হয়ে থাকে. সব সময়েই একজন কর্মী থাকে, যে নানা কারণের জন্য: সেটা তার নীতিগত কারণই হোক, বা সে কারোর প্রতি প্রতিশোধ নিতে চায় বলে, কোন না কোন তথ্য প্রতিযোগীদের কাছে পৌঁছে দেয়, বিপক্ষের গুপ্তচরদের কাছে দেয় অথবা সেই ধরনের সাইট কে দেয়, যেমন "উইকিলিক্স"".

    বেশীর ভাগ তথ্য, যা উইকিলিক্স সাইটে রয়েছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির প্রসঙ্গেই. ইন্টারনেটে আফগানিস্তানের যুদ্ধ নিয়ে গোপন খবর ফাঁস হয়েছে. এই তথ্য অনুযায়ী ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী এই যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, তালিবদের আক্রমণ বেড়েই চলেছে, শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে মৃত লোকের সংখ্যা সংবাদ মাধ্যমে যতটা প্রকাশিত হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশী. ইন্টারনেটে আমেরিকার কূটনৈতিক কর্মীদের চিঠিপত্রও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে অন্যান্য দেশ নিয়ে অকূটনৈতিক মন্তব্য রয়েছে. যেমন, রাশিয়াকে সেখানে বলা হয়েছে মাফিয়া রাজ হিসাবে. এই ধরনের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়াতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সম্মান হানীর কারণ হয়েছে. সেই কারণেই এখন তারা এক সারি আইনের খসড়া গ্রহণ করতে চেয়েছে, যা দিয়ে তারা ইন্টারনেটের উপরে ভাল করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে, এই কথা মনে করে রাজনৈতিক কাঠামো গবেষণা কেন্দ্রের পররাষ্ট্র নীতিতে বিশেষজ্ঞ ইভগেনিয়া ভইকো বলেছেন:

    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন বাস্তবেই যথেষ্ট সক্রিয় ভাবে প্রচেষ্টা করা হচ্ছে অন্য অভিমত প্রকাশের চেষ্টা বাধা দেওয়া বা দেশের প্রশাসনকে, তাদের পররাষ্ট্র নীতিকে টলমলে করে দেওয়া যায় নতুবা তার অক্ষমতা প্রমাণ করা যায়, এমন কোন রকমের মত উঠলেই তাকে দাবিয়ে দেওয়ার. প্রথমে এটা ততটা খেয়াল করার মতো ছিল না যে, বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিন্টন বাজে খেলাতেও ভাল মুখ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন, নানা ভাবে নিজেদের স্বপক্ষে কথা বলে ও প্রকাশ করে যে, এই সব তথ্য বাস্তবের সঙ্গে মেলে না".

    এই কথা সত্য যে, এখন ইন্টারনেটের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্ব জোড়া আনন্দ প্রকাশের এক বছর কেটে যাওয়া পরে, এক ধরনের বোধ এসেছে যে, তা খুবই সাংঘাতিক হতে পারে. উইকিলিক্স সাইটের উদাহরণ বিশ্বের স্তরে প্রমাণ করেছে যে, কোন তথ্যই একেবারে সুরক্ষিত করা সম্ভব নয়, সেটা ব্যক্তিগত হোক বা সমষ্টিগতই হোক, বরং অনেকের তথ্য হলে, তা আরও দ্রুত ও সহজেই জানাজানি হয়ে যেতে পারে.

    উইকিলিক্স সাইট নিয়ে কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় আঘাত তার স্রষ্টা জুলিয়ান আসাঞ্জের উপরেই পড়েছে, যাকে ২০১২ সালেই গ্রেট ব্রিটেন থেকে বার করে সুইডেনে পাঠানো হতে পারে, যেখানে তার নামে অভিযোগ রয়েছে ধর্ষণের. ব্র্যাডলি ম্যানিং, যে উইকিলিক্স সাইটের প্রধান তথ্য সরবরাহ করেছে, তাকে এখন বিচার করা হচ্ছে, তার জন্য হয় মৃত্যুদণ্ড অথবা আজীবন কারাদণ্ড অপেক্ষা করছে.