মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত ইউরোপীয় আদালত বাস্তবে সম্পূর্ণ ভাবেই মস্কোর দুবরোভকা থিয়েটারে সন্ত্রাসের ফলে ক্ষতিগ্রস্থদের ও নিহতদের আত্মীয় পরিজনের দাবী মেনে নিয়েছে. আদালতের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে থিয়েটার হলে অজানা গ্যাস ব্যবহার করার পরে এই ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্থদের যথোপযুক্ত চিকিত্সা সহায়তা করা হয় নি. এর ফলে শুধু সন্ত্রাসবাদীরাই মারা যায় নি, বরং অনেক সংখ্যায় তাদের হাতে আটকে পড়া মানুষও মারা গিয়েছেন. স্ট্রাসবুর্গ শহরের আদালত রাশিয়াকে মৃতদের পরিজন ও ক্ষতিগ্রস্থদের সর্বমোট ১২ লক্ষ ৫৪ হাজার ইউরো পরিমান অর্থ দেওয়ার জন্য রায় দিয়েছে.

    ২০০২ সালের হেমন্তে দুবরোভকা থিয়েটার হলে ট্র্যাজেডি ঘটেছিল. নর্ড- অস্ট নামের এক তত্কালীণ বিখ্যাত নৃত্যনাট্য অনুষ্ঠান চলার সময়ে ৪০ জন জঙ্গীর এক সশস্ত্র দল সেখানে ঢুকে পড়ে ও ৯১২ জন লোককে তাদের বন্দী বলে ঘোষণা করে, তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক মহিলা ও শিশু. প্রায় তিন দিন পরে দেশের শক্তি প্রয়োগ কারী দলের লোকেরা এই থিয়েটার কেন্দ্রে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল. বেশীর ভাগ সন্ত্রাসবাদীকেই মেরে ফেলা হয়েছিল. সন্ত্রাসের ঘটনায় প্রাণ দিয়েছিলেন ১৩০ জন বন্দী.

    আট বছর ও সাত মাস ধরে স্ট্রাসবুর্গ শহরের আদালত দুটি অভিযোগ, যা সব মিলিয়ে ৬৪ জনের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল ও যাদের এই নর্ড- অস্ট ঘটনার শিকার বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল, তা বিচার করেছে. প্রত্যেককেই ইউরোপীয় আদালত ৮ থেকে ৬৬ হাজার পর্যন্ত ইউরো পরিমান অর্থ মানসিক ক্ষতির জন্য দিতে বলা হয়েছে. ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট ইগর তুরনভ উল্লেখ করেছেন যে, ইউরোপীয় মানবাধিকার রক্ষা আদালতের রায় এখন দুবরোভকা সন্ত্রাস কাণ্ডের ফরিয়াদী ও সামাজিক মামলা গুলিকে আবার করে বিচারের অধিকার দিয়েছে, তিনি যোগ করেছেন:

    "আমাদের মূল দাবী – ইউরোপীয় কনভেনশনের মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনের দ্বিতীয় ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে – এটা জীবনের অধিকার. তার মধ্যে এটা এই মামলায় বিচারের পদ্ধতি ভঙ্গ করা হয়েছে বলে অভিযোগের রায়ও বটে. রাশিয়া এই কারণে জরিমানা দিতে বাধ্য যে, এখানে কনভেনশনের দাবী মানা হয় নি – জাতীয় স্তরে ক্ষতিপূরণের জন্য বিচার প্রক্রিয়াকে শেষ অবধি নিয়ে যাওয়া হয় নি. তাই ইউরোপীয় আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হওয়ার পরে আমরা দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবো. এই মামলার শেষ দাঁড়ি এখনও টানা হয় নি".

    ক্ষতিগ্রস্থ লোকেরা একই সঙ্গে দাবী করেছিলেন যে, বন্দী মুক্তির জন্য দেশের শক্তি প্রয়োগ বাহিনী যথোপযুক্ত আইন সঙ্গত শক্তি প্রয়োগ করে নি. অর্থাত্ পুলিশের নেতৃত্ব এই হল দখলের জন্য নির্দেশ দেওয়ার অধিকার অর্জন করেন নি. কিন্ত ইউরোপীয় মানবাধিকার রক্ষা আদালত রায় দিয়েছে যে, এখানে কথা হচ্ছে শুধু বিশেষ অপারেশনের সময়ে সফল হওয়া সম্পূর্ণ ভাবে সম্ভব হয় নি, এই কথা উল্লেখ করে ইগর তুরনভ বলেছেন:

    "এই প্রশ্ন একটি অত্যন্ত বেদনা দায়ক প্রশ্ন. আদালত স্বীকার করেছে যে, ত্রাণের জন্য অপারেশন যথেষ্ট সফল হয় নি কারণ ত্রাণ কিভাবে করা হবে ও তার জন্য প্রয়োজনীয় লোকদের সময় মতো সংযুক্ত করার জন্য তথ্য দেওয়া হয় নি, ফলে অনেকেই ছিলেন অপ্রস্তুত. এটাও স্বীকার করা হয়েছে যে, এখানে যে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছিল, তা সুস্থ লোকেদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ ও অসুস্থদের মৃত্যুর কারণ হয়েছে".

    প্রসঙ্গতঃ, বেশীর ভাগ বিশেষজ্ঞই – তা রুশী ও বিদেশীরা অন্য রকম ভাবেন এই বিষয়ে. থিয়েটার কেন্দ্রে হামলা ও তার পরে বেশীর ভাগ মানুষকে উদ্ধার করার পরে এটাকে সফল বলে মানা হয়েছিল, আর শক্তি প্রয়োগ সম্বন্ধে মানবাধিকার রক্ষা কর্মীদের সন্দেহ উদ্রেক হয়েছিল অনেক পরেই. সন্ত্রাস বিরোধী বাহিনীর ভেটেরানদের সংস্থা "আলফার" সভাপতি সের্গেই গনচারোভ এখন অবধি স্থির ভাবেই বিশ্বাস করেন যে, থিয়েটার কেন্দ্রে এই ভাবেই আক্রমণ করে বন্দী উদ্ধার করাই একমাত্র সম্ভাব্য পথ ছিল ও সবচেয়ে কম মানুষকে ক্ষতিগ্রস্থ করা সম্ভব ছিল. তিনি বলেছেন:

    "বিশেষ বাহিনী ঠিক কাজই করেছে. অনেক বিশ্লেষক স্বীকার করেন যে, সেই পরিস্থিতিতে অপারেশন সফল হয়েছিল. এর পরে যা হয়েছিল, তা সেই সমস্ত লোকেদের সমস্যা, যারা চিকিত্সা নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন. আর সরকার যে বিষয়ে বাধ্য, অর্থাত্ এই সমস্ত লোকেদের অর্থ দেওয়ার বিষয়ে ও মানসিক ভাবে তাদের যথাযোগ্য সহায়তা করার সম্বন্ধে, আমি মনে করি, সেটা একেবারেই ঠিক".

    বিশেষ শক্তি প্রয়োগ বাহিনীর বিরুদ্ধে বলা হয়েছে যে, তারা চিকিত্সকদের আগে থেকে বিশেষ অপারেশনের পদ্ধতি নিয়ে কিছু জানান নি. চিকিত্সকেরা অপেক্ষা করেছিলেন গুলি ও বোমার ঘায়ে আহত মানুষদের জন্য – অর্থাত্ তাঁরা হিসাব করেছিলেন শল্য চিকিত্সকদের উপস্থিতি প্রয়োজন, বিষ প্রয়োগের চিকিত্সক নয়. আবার অন্য দিক থেকে, সেই কারণেই এটাকে বলা যায় বিশেষ অপারেশন, যে তা করা হয়ে থাকে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করে ও চিকিত্সকদের তৈরী থাকা দরকার যে কোন ধরনের ঘটনা পরিবর্তনের জন্যই.

    যাই হোক, রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউরোপীয় মানবাধিকার রক্ষা আদালতের দায়িত্ব সম্পন্ন ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক ভাবেই মূল্যায়ণ করেছেন. রাশিয়ার উপ আইন মন্ত্রী গিওর্গি মাতিউশকিন উল্লেখ করেছেন যে, আগামী তিন মাসের মধ্যে – ইউরোপীয় কনভেনশন অনুযায়ী – এই সমস্ত দলিল পর্যালোচনা করা হবে ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে- আদালতের রায় নিয়ে অভিযোগ করা হবে কি না.