এক লক্ষেরও বেশী নিহত শান্তিপ্রিয় মানুষ, প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র ও দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা – ইরাক দীর্ঘ নয় বছরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটের সামরিক উপস্থিতির মূল্যায়ণ এই ভাবেই করেছে. ১৮ই ডিসেম্বর আমেরিকার শেষ সামরিক সাঁজোয়া গাড়ীর বহর ইরাক ও কুয়েইত সীমান্ত পার হয়ে চলে গিয়েছে. রাষ্ট্রপতি ওবামা তাঁর প্রাক্ নির্বাচনী আশ্বাস পূর্ণ করেছেন. সামরিক আগ্রাসনের শেষ সম্বন্ধে মন্তব্য করে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আমেরিকার সৈন্যরা মাথা উঁচু করেই ইরাক ছেড়ে যাচ্ছে. ইরাকের লোকেরা ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কিছুই রেখে যায়নি, দেশের মধ্যে বিরোধ ও জ্বলে যাওয়া ভূমি ছাড়া.

    ১৯শে ডিসেম্বরেই ইরাকের আদালত দেশের উপ রাষ্ট্রপতি ও সুন্নী মুসলমানদের "আল ইরাকিয়া" দলের নেতা তারিক আল- হাশেমী কে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারী করেছে. ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি তাঁকে ক্ষমতা দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন. এই ভাবেই সুন্নী ও শিয়া মুসলমানদের মধ্যে খোলাখুলি বিরোধ – যা আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল ও এত ভয় পাওয়া হয়েছিল – তা বাস্তবেই সক্রিয় স্তরে পৌঁছেছে.

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটের সেনা বাহিনীর ইরাক আক্রমণ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে. এর জন্য লোক দেখানো যুক্তি ছিল তথাকথিত গুপ্তচর দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যে, সাদ্দাম হুসেইনের কাছে রয়েছে গণ হত্যার অস্ত্র (পরে অবশ্য তার চিহ্নও প্রমাণ করতে পারা যায় নি). তার মধ্যে জর্জ বুশ জুনিয়র ইরাকে সেনা বাহিনী পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছ থেকে কোন রকমের অনুমতি না নিয়েই. তাঁর এই পদক্ষেপের জন্য উত্তরসূরী ওবামাকে উত্তর দিতে হয়েছে. তাঁর একটি প্রাথমিক কাজ ছিল যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ বন্ধ করা. ডিসেম্বর মাসের শুরুতে ওবামা ঘোষণা করেছিলেন যে ইরাকের যুদ্ধের শেষ হয়েছে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অন্যান্য হুমকি নিয়ে মনোযোগ দিতে পারে, তিনি বলেছেন:

    "ইরাক ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে আমাদের সম্ভব হবে আফগানিস্তানে নিজেদের শক্তিকে জড়ো করার, "আল- কায়দা" দলকে হারের কাছে নিয়ে আসা ও আরও ভাল করে তৈরী হওয়া অন্য সমস্ত হুমকির জন্য, যা আমাদের জন্য সম্ভবতঃ হতে পারে".

    "আল- কায়দা" দলকে আফগানিস্তানে হারের কাছে নিয়ে আসার জন্য আমেরিকা ও তার জোটের শরিকরা বিগত দশ বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে – কিন্তু কোন ফল হচ্ছে না. ইরাকে তারা এর চেয়ে কম সময় ছিল – কিন্তু খরচ করেছে তার চেয়ে অনেক বেশী. শুধু সামরিক অপারেশনের কারণেই খরচ দেখানো হয়েছে এক লক্ষ কোটি ডলার. কিন্তু আরও প্রায় তিন লক্ষ কোটি ডলার হবে তার আনুষঙ্গিক খরচ, এই কথা উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরাই. আমেরিকার সরকার বলছে যে, অর্থ শুধু শুধুই খরচ করা হয় নি. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের প্রধান লিওন প্যানেত্তা বাগদাদে সেনা বাহিনীর মিশন বন্ধ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন:

    "আমরা এই প্রশাসনিক ক্ষমতা হাতে তুলে দিচ্ছি ও ইরাককে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা সবসময়েই সত্য বন্ধু ও সহযোগী বলে ভাবতে পারে. আর সমস্ত জীবন, যা এই যুদ্ধে আহুতি দেওয়া হলো, তা বিনা কারণে করা হয় নি".

    ইরাক থেকে আমেরিকার লোকেদের চলে যাওয়ার পরে সত্যই নতুন সময় শুরু হতে চলেছে, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত. কিন্তু সেখানে কোন শান্তি সংক্রান্ত সম্ভাবনা নেই, এই কথা উল্লেখ করে স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ সের্গেই দেমিদেঙ্কো বলেছেন:

    "এখন স্পষ্ট করেই বলা যেতে পারে য়ে, ইরাক কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে. কুর্দ লোকেরা এখন স্বয়ং শাসিত ভাবেই আছে. এরপরে তৈরী হয়েছে প্রশাসনিক শূণ্য স্থান, যা পূর্ণ করার চেষ্টা করছে সবচেয়ে রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ও তাদের মধ্যে চরমপন্থী শক্তিরা".

    যারা রয়েছে – যোগ করে বলি – দেশের সমস্ত রকমের প্রজাতির মধ্যেই. তাই ভবিষ্যত নিয়ে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে – তা ভাল নয়. আমেরিকার লোকেরা নিজেদের পরে রেখে গেলো প্রচুর সমস্যা, যা ইরাকের লোকেদেরই এখন সমাধান করতে হবে. আর এই সমাধানের জন্য সময় – খুব একটা বেশী নেই.