পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারী হঠাত্ করেই সোমবার ভোর রাতে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন, যেখানে তাঁর চিকিত্সা হচ্ছিল. করাচী শহরের সামরিক ঘাঁটিতে জারদারীর বিমান অবতরণ করেছে. রাষ্ট্রপতির প্রত্যাবর্তন, পাকিস্তানের সমাজে ওঠা এক ঝাঁক মন গড়া ধারণা ও শোনা কথার অবসান করেছে. বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    দুবাইতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রপতি এক উচ্চগ্রামে আওয়াজ করা রাজনৈতিক স্ক্যাণ্ডালের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে সন্দেহ করা হয়েছিল যে, তিনি গোপনে আমেরিকার প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা খুঁজে দেখতে চেয়েছিলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব বদল করানোর জন্য ও নিজের তাঁবেদার লোকদের সেই জায়গায় নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন. এই খবরে অসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল. স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের পক্ষ থেকে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করার জন্য "মেমোগেট" নামে তথাকথিত স্ক্যাণ্ডালের ঝড় তোলা হয়েছিল. সম্ভাব্য সামরিক বিদ্রোহের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল. সরকারি পক্ষ থেকে এই ধরনের ধারণাকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এই সব শোনা কথা আরও বেশী করেই ছড়িয়ে পড়ছিল. জারদারীর পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের পরে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি পালিয়ে যান নি ও কেউই তাকে হুমকি দিচ্ছে না. খুবই দ্রুত সামরিক বিদ্রোহের সম্ভাবনা কম গিয়েছে. ১৯শে ডিসেম্বর, যেদিন জারদারী পাকিস্তানে এসে নেমেছেন, দেশের হাইকোর্ট ইসলামাবাদে "মেমোগেট" নিয়ে শুনানী শুরু করেছে, যার একজন মুখ্য অভিযুক্ত বর্তমানের রাষ্ট্রপতি. কিন্তু সামরিক বিদ্রোহ আর হবে না, এই কথা উল্লেখ করে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ মুহামেদ ফারুক বলেছেন:

    "সামরিক বাহিনী, সমস্ত রাজনৈতিক দল ও জোট, তার মধ্যে ইমরান খানের "ন্যায়ের দলও" রয়েছে আর রয়েছে নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ, আর অবশ্যই পাকিস্তানের জাতীয় জনতা দলও চেয়েছে এই মামলার খুঁটিয়ে তদন্ত করা হোক. কিন্তু এরা সকলেই চায় না যে, সামরিক বাহিনী দেশের নেতৃত্ব দিক ও ক্ষমতা দখল করুক. এই ক্ষেত্রে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিই একমত. একটা বোধের উদয় হয়েছে যে, এখন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্কার ও তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরে,  উত্তেজনা কমবে.আর এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে".

    এই ধরনের দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়ার রাজনীতিবিদ পিওতর তোপীচকানভ বলেছেন:

    "আসিফ আলি জারদারীর সময়ে দেশে সামরিক বাহিনী প্রসারিত ভাবে স্বশাসনের ক্ষমতা পেয়েছে. সেনা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে. আজ সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের প্রধান শক্তিতে পরিনত হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট এদের সঙ্গে সরাসরি ভাবে সমস্যা সমাধান ও অর্থ সাহায্য করে থাকে, সরকারের প্রয়োজন বোধ করে না. আর এটা, অবশ্যই, তাদের জন্য ঠিক আছে. কিন্তু, যদি সামরিক বিদ্রোহ ঘটে, তাহলে সেনা বাহিনীকে পাকিস্তানের সমস্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, আবার জবাবদিহি করতেও হবে. আর এটা এখন তাদের একেবারেই দরকার নেই. তাছাড়া বর্তমানে সামরিক বাহিনীকে কেউ বাধা দিচ্ছে না. বর্তমানের অসামরিক প্রশাসন কোন ভাবেই সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করছে না. চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে. তাই সেনা বাহিনীও এখন খুব একটা অসামরিক প্রশাসনকে বদলাতে চায় না".

    এখানে অবশ্যই বাদ দেওয়া যায় না যে, জারদারীর প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গে অসামরিক প্রশাসন সেনা বাহিনীর সঙ্গেও সহমতে এসেছে. ফলে জারদারীকে নির্দিষ্ট করে ভরসা দেওয়া হয়েছে, তা না হলে মনে তো হয় না যে তিনি দেশে আর ফিরে আসতেন. এটার সমর্থনে অংশতঃ বলা যেতে পারে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানি পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর প্রধান আশফাক কিয়ানির সঙ্গে শুক্রবারে তিন ঘন্টা বৈঠক করেছেন. তাঁরা সহমতে এসেছেন যে, "মেমোগেট" স্ক্যাণ্ডাল নিয়ে আরও জল ঘোলা হলে তা খালি বিরোধী পক্ষ ও চরমপন্থীদের উপকারই করবে, যারা এমনিতেই রাষ্ট্রপতি জারদারী ও তাঁর নীতিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকে. ইউসুফ রেজা গিলানির উদ্যোগে আশফাক কিয়ানির সঙ্গে আসিফ আলি জারদারীর সরাসরি টেলিফোনে কথাও হয়েছে. এই আলোচনা পাকিস্তানের "ট্রিবিউন" সংবাদপত্রের দেওয়া খবর অনুযায়ী বিরোধের উপশম করেছে. আশা জেগেছে যে, দেশে সামরিক বিদ্রোহ হবে না. আর "মেমোগেট" থেকে বেরোবার পথ মনে হয়েছে বোধহয় এর মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে.