লোকপাল বিল, যে আইন নিয়ে আলোচনা মাস দুয়েক আগে কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল, তা আবার ভারতবর্ষের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির মুখ্য বিষয়  হয়েছে. সর্ব দলীয় বৈঠক, যা গত বুধবারের রাত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আহ্বান করেছিলেন, তার অর্থ হয়েছে যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে গভীর বিরোধ বজায় রয়েছে. আর যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে যাতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের লোকসভায় এই আইন গ্রহণের জন্য আলোচনা শেষ হয়, তাও এই প্রতিবাদ আন্দোলনের উদ্যোক্তা অণ্ণা হাজারে এর মধ্যেই তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করেছেন যে, ১লা জানুয়ারীর আগে থেকেই আবার নতুন অনশন করা শুরু করবেন, যদি লোকসভার এই বারের অধিবেশনেই আইন গৃহীত না হয়, তাহলে.

অণ্ণা হাজারে ও তার পারিষদদের শুরু করা আন্দোলন এই বছরের আগষ্ট মাসের শেষে স্থগিত রাখা হয়েছিল, যখন সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, তাঁর দাবী পূরণের জন্য তৈরী. আর এখন আইনের খসড়া তৈরী হয়ে গিয়েছে. সরকারি প্রতিনিধির কথামতো, এই আইন ২০ শে ডিসেম্বরের আগেই লোকসভায় আনা হবে. কিন্তু এখন আবার একটা সমস্যা শুরু হয়েছে: লোকসভার শীত কালীণ অধিবেশন শেষ হতে চলেছে ২২শে ডিসেম্বর. খুবই কম সম্ভাবনা রয়েছে যে, তারই মধ্যে এত অল্প সময়ে এই আইন গ্রহণ করা সম্ভব হবে.

তাই অণ্ণা হাজারে ও তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা দাবী করেছেন লোকসভার অধিবেশনের সময়সীমা বৃদ্ধি করার ও ক্রিসমাসের পরেই এই নিয়ে আলোচনা করার. প্রসঙ্গতঃ এটাই একমাত্র কারণ নয়, যার জন্য অণ্ণা হাজারে আবার অনশনের হুমকি দিচ্ছেন ও সত্যাগ্রহ করতে চাইছেন. আইনের খসড়াতে এখনও অনেক বেশী ধারার ক্ষেত্রে সর্ব সম্মতি ক্রমে তৈরী করা হয় নি, এই কথা বলেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজি অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি যোগ করেছেন:

"যা বিশেষ করে যোগ করার দরকার রয়েছে, তা হল এই বছরের বর্ষাকালের শেষে – শরত্কালের শুরুতে সবচেয়ে বড় তর্কের বিষয় ছিল লোকপাল বিলের আওতায় প্রধানমন্ত্রী সহ দেশের সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদেরও আনা. এখন, দেশে ক্ষমতাসীন ইউপিএ ও ভারতীয় কংগ্রেস দলের নেতাদের ঘোষণা অনুযায়ী বেশীর ভাগ সদস্যই এই মর্মে একমত যে, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি প্রসঙ্গে অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের উর্দ্ধে থাকতে পারেন না, তবে এই ধরনের বিষয়ে তদন্ত করা যেতে পারে শুধু এমন ভাবে, যাতে দেশের পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও ক্ষতি না হয়".

বিরোধী পক্ষ সরকারের সঙ্গে বিরোধের জন্য নতুন ধারা অবতারণা করেছে – যেখানে বলেছে যে, রাষ্ট্রীয় তদন্ত ব্যুরো কে লোকপাল বিলের আধিকারিক নির্দেশ দিতে পারেন. তা না হলে, বিরোধী পক্ষ যেমন উল্লেখ করেছে যে, লোকপাল আধিকারিক যে কাজ করবেন, তাতে কোনও ক্ষমতা থাকবে না ও তা হবে শুধু প্রদর্শনী মূলক.

সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীক্ষ্ণ বাদানুবাদের ফলে একেবারেই আচমকা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) ও ভারতীয় জনতা দলের মধ্যে এক জোট সৃষ্টি হয়েছে. এই জোট কয়েক মাস আগে একেবারেই অসম্ভব মনে হয়েছিল, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

"এই বিলের চারপাশ জুড়ে এত কোলাহল মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আসলে এটা আইন প্রণয়নের জন্য করা হচ্ছে না, বরং একেবারেই অন্য ধান্ধা নিয়ে করা হচ্ছে. লোকপাল বিল সংক্রান্ত সমস্ত আন্দোলন, বাদানুবাদ বাস্তবে দেখিয়েছে যে, এই লোকপাল বিল এমন এক অস্ত্রে পরিনত হয়েছে যা ভোটের লড়াইয়ের আগে বিরোধী পক্ষের হাতে এসেছে. এখানে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, দেশের বেশ কিছু বড় রাজ্যে রাজ্য সভার নির্বাচন ২০১২ সালের শুরুতেই হবে. সারা ভারত জুড়ে ভোট হওয়ার কথা সেই ২০১৪ সালে, কিন্তু বিরোধী পক্ষ সময়ের আগেই নির্বাচন করার আশা ছাড়তে পারছে না.

আর তাই বিরোধী পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, সব সময় সরকারকে চাপের মুখে রেখে দেওয়া, যাতে সরকার পক্ষ ছাড় দিতে বাধ্য হয় ও নির্বাচকদের চোখে হেয় হয়. আসলে – অণ্ণা হাজারে যতই ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করে থাকুন না কেন – তাঁকে যাঁরা আজ সমর্থন করছেন, সেই রাজনৈতিক শক্তিরা একেবারেই দ্রুত আইন প্রণয়নের পক্ষে নন".

যত বেশী করে এখন থাকবে চাপের অবস্থা, তত সহজ হবে বিরোধী পক্ষের সরকারকে বিস্তারিত সমস্যার ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ মতো কাজ করতে বাধ্য করার. আর তার ফলে – নিজেদের জন্য নির্বাচনে ভাল ফল করার, এটাই রুশ বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন.