প্রধানমন্ত্রী ও আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী ভ্লাদিমির পুতিন আজ সরাসরি রুশ নাগরিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন. তাঁর সঙ্গে সওয়াল জবাব শুরু হয়েছিল টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও মাধ্যমে আজ মধ্য দিনে. এটি ভ্লাদিমির পুতিনের সরাসরি প্রশ্নোত্তরের দশম জয়ন্তী বার. আগের বার গুলির মতোই, এই প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের বিভিন্ন কোন থেকে প্রশাসনের প্রধানের সঙ্গে যোগ সাধন করা সম্ভব হয়েছে. নিজেদের প্রশ্ন লোকেরা আগেই ইন্টারনেট, এস এম এস মাধ্যমে ও টেলিফোনে বিশেষ করে এই উপলক্ষে তৈরী কল সেন্টারের মাধ্যমে করতে শুরু করেছিলেন, তাছাড়া রাশিয়ার বৃহত্তম শহর গুলিতে আলাদা করে ভ্রাম্যমান টেলিভিশন স্টুডিও খোলা হয়েছিল, যেখান থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা সম্ভব হয়েছে.

রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়া বাসীদের আহ্বান জানিয়েছেন, বাড়িতে বসে না থেকে ২০১২ সালের মার্চে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে ভোট দিতে. দেশের নাগরিকদের প্রশ্নে “প্রত্যক্ষ সম্প্রচারে” উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, “শুধু আপনারাই নির্ধারণ করবেন কে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে কাজ করবে, কে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, কে আমাদের আভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে, কে সামাজিক সমস্যা বলির মীমাংসা করবে, কে অর্থনীতির প্রশ্নাবলি মীমাংসা করবে – শুধু আপনারাই তা করবেন, আপনারা ছাড়া আর কেউ নয়.  আমি তাদের কাছে আবেদন করতে চাই, যাঁরা ভোট দিতে প্রস্তুত, রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী হিসেবে আমার পক্ষ থেকেও. আপনারা ছাড়া আর কেউ তা করবে না”, স্থিরবিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর.

প্রত্যক্ষ সম্প্রচারে রাশিয়া বাসীদের প্রশ্নের উত্তরে পুতিন বলেন যে, ২০১১ সালে রাশিয়ার অর্থনীতির বৃদ্ধি হবে ৪.২ – ৪.৫ শতাংশ. মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণ কম – ৬ শতাংশের সামান্য বেশি, বেকারী -৬ শতাংশ. দেশে বেতনের বাস্তব বৃদ্ধি ছিল ২.৯ শতাংশ. রাশিয়ায় দৈন্যের সীমারেখার নিচে বাস করে ১২.৫ শতাংশ মানুষ, এবং এ সংখ্যাটি ক্রমশ কমছে. এ ছাড়া, রাশিয়া শষ্য রপ্তানির ক্ষমতা পুনর্স্থাপন করেছে এবং এখন সে পৃথিবীতে শষ্য রপ্তানী বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানের অধিকারী. পুতিনের কথায় রাশিয়ার শষ্যের অন্যতম বৃহত্ ক্রেতা হল মিশর. আগে রাশিয়া বিপুল পরিমাণ শস্য কিনত অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য দেশ থেকে. প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, শষ্য রপ্তানির ক্ষমতার পুনর্স্থাপন সম্ভব হয়েছে কৃষি ক্ষেত্রের কর্মীদের শ্রম ও প্রতিভার কল্যাণে.  রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন যে, যদি লোকেদের জন্য নিজের দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশে সম্ভাবনার উদ্ভব হল “পুতিন শাসনের ফলাফল”, তাহলে এটা স্বাভাবিক. বৃহস্পতিবার প্রত্যক্ষ সম্প্রচারের সময় পুতিন বলেন, “লোকে যে দেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজের দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করছে – এটা একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার. যতক্ষণ পর্যন্ত সবকিছু আইনের কাঠামোতে থাকবে, আর আমি তার উপর ভরসা রাখছি, সবকিছু ঠিকই হবে”. পুতিনের কথায়, তিনি “টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছেন” যে, প্রধাণত তরুণরা “সক্রিয়, তাদের নিজস্ব অবস্থান আছে যা তারা স্পষ্ট ও সঠিক ভাবে বলে থাকেন”. তিনি যোগ করে বলেন, “আমাকে তা আনন্দিত করে, এবং এটা যদি “পুতিনের শাসনের” ফল হয়, তাহলে এটা ভালই, এতে এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি না, যা অভাবনীয়”. একই সঙ্গে তিনি বলেন যে, রাশিয়ায় পার্লামেন্টারী নির্বাচনের ফলাফল দেশে শক্তির বাস্তব বিন্যাস প্রতিফলিত করছে. রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন এই দশম বার “প্রত্যক্ষ সম্প্রচারে” রাশিয়াবাসীদের সাথে আলাপ করছেন “ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে সংলাপ. ক্রমানুবর্তন” নামের অনুষ্ঠানে. এই প্রথম ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াবাসীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী হিসেবে থাকা কালে. রাশিয়ায় রাষ্ট্রপতির নির্বাচন হবে ২০১২ সালের মার্চ মাসে. এ সংলাপের সময়ে প্রধানমন্ত্রী তীক্ষ্ণ প্রশ্নাবলির উত্তর দেওয়া এড়িয়ে যেতে চান না, জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য সম্প্রচার সম্পাদক দিমিত্রি পেসকোভ. রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ একনিষ্ঠ ও কঠোরভাবে দূর্নীতিপরায়ণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, এখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকা উচিত্ নয়. এ সম্বন্ধে বৃহস্পতিবার রাশিয়ার নাগরিকদের সাথে সংলাপে বলেছেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন. ভ্লাদিমির পুতিন “প্রত্যক্ষ সম্প্রচারে” সংলাপের সময় পরিসংখ্যান তথ্য দিয়েছেন, যা অনুযায়ী, রাশিয়ায় দূর্নীতিপরায়ণদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে, কিন্তু আদালতে বিচারের জন্য গেছে মাত্র কয়েকশো-টি. আর তাদের মধ্যে আদালত যাদের দোষী বলে স্বীকার করেছে তাদের সংখ্যা মাত্র গোটা দশেক. প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এমন দৃষ্টান্তও আছে, যখন গভর্নরদেরও জেলে ভরা হয়েছে, এবং তারা শাস্তির পুরো মেয়াদ জেলে কাটিয়েছে. পুতিন যোগ করে বলেন, “উপ-মন্ত্রীর পর্যায়ের লোকেদেরও জেলে ভরা হয়”. রাশিয়া নিজের পররাষ্ট্র নীতি এমন ভাবে গড়ে তুলবে না, যেন শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে রয়েছে. এ সম্বন্ধে “সওয়াল জবাবের” সময় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন. দুই-মেরু সম্বলিত জগতের তুলনায় বহুমেরু সম্বলিত জগত অনেক বেশি জটিল, এর উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন যে, “লোকে একটি দেশের – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদেশে থাকতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে”. পুতিনের কথায়, “কখনও কখনও মনে হয় য়ে, আমেরিকার প্রয়োজন শরিকের নয়, প্রয়োজন স্তাবকের”. তবুও, রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা করবে. লিবিয়া বিপ্লবের প্রাক্তন নেতা মুহাম্মর গাদ্দাফিকে ধ্বংস করেছে বিদেশী ড্রোন বিমান, সেই সঙ্গে মার্কিনী ড্রোন বিমানও, এই রকম মনে করেন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন. সারা পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে গাদ্দাফিকে,- সবকিছু ছিল রক্তাক্ত. পুতিন যোগ করে বলেন যে, কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়েছে কোনো বিচার বা তদন্ত ছাড়া. রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, গাদ্দাফির হত্যা তথাকথিত “গণতন্ত্রের মানের” সাথে সুসঙ্গত কিনা. রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন যে, মার্কিনী সেনেটর জন ম্যাককেইনের হুমকি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে নয়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নির্দেশিত. “প্রশ্নোত্তরের” সময় রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয় ম্যাককেইনের বিবৃতি সম্পর্কে তাঁর মত কি, যিনি অক্টোবরে রাশিয়াকে তুলনা করেন লিবিয়ার সাথে এবং বলেন যে, গাদ্দাফির হত্যায় পুতিনের চিন্তিত হওয়া উচিত. পুতিন উল্লেথ করেন যে, পশ্চিমের দেশগুলি এখনও পর্যন্ত রাশিয়ার পারমাণবিক ক্ষমতায় ভয় পাচ্ছে. রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কথায়, লিবিয়ার পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ উপায়ে মীমাংসা করা উচিত্ ছিল.   

রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন বলেন যে, “রঙীন বিপ্লব” – সমাজকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত নক্সা. রাশিয়ার নাগরিকদের সাথে সংলাপের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, “মনে হয়, তা আপনা- আপনি ভাবে দেখা দেয় নি”. তিনি মনে করিয়ে দেন ইউক্রেনে “কমলা বিপ্লবের” সময়ের ঘটনাবলির কথা. পুতিন বলেন, “প্রসঙ্গত, আমাদের কিছু কিছু বিপক্ষবাদী সে সময়ে ইউক্রেনে ছিলেন এবং তখনকার রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে সরকারীভাবে কাজ করেছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই ঐ প্রয়োগ পদ্ধতি রাশিয়ার ভূমিতে আনতে চেষ্টা করছেন”.

পুতিন মনে করেন ইন্টারনেটে বাধানিষেধ প্রবর্তন রাজনৈতিক দিক থেকে ভুল. এই মাধ্যম খুবই স্বাধীন ও সব চেয়ে বেশী গণতান্ত্রিক. "আমি মনে করি ইন্টারনেট আটকে দেওয়ার দরকার নেই, - এটা প্রযুক্তিগত ভাবেও জটিল. যদি প্রশাসন বা অন্য কারও ভাল না লাগে যে, ইন্টারনেটে যা হচ্ছে, তাহলে একটাই পথ রয়েছে তার বিরোধীতা করার: সেটা সেই ইন্টারনেট মাধ্যমেই, সমাধানের পথ বাতলাতে হবে অন্য ভাবে ও তা আরও বেশী গঠন মূলক ভাবে করতে হবে". একই সঙ্গে পুতিন স্বীকার করেছেন যে, ইন্টারনেট অপরাধের উদ্দেশ্য নিয়েও ব্যবহার করা হয়ে থাকে. তাঁর মতে আইন শৃঙ্খলা বিভাগ খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতে বাধ্য যে, সেখানে কি হচ্ছে, কিন্তু তা ইন্টারনেট বন্ধ করে বা বাধা তৈরী করে নয়. তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ধীরে হলেও ইন্টারনেট সমাজে সংস্কৃতির মান উন্নত হবে.

0সওয়াল জবাব পর্বে এবারে পুতিন নিজের রেকর্ড আবার ভেঙেছেন, গতবারে তিনি ৪ ঘন্টা ২৬ মিনিট একটানা জবাব দিয়েছেন, দেশের লোকেদের ৯০টি প্রশ্নের জবাব দিতে পেরেছেন. এবারে সাড়ে চার ঘন্টা সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে ৮৮টি প্রশ্ন করা সম্ভব হয়েছে. পুতিন মস্কোর স্টুডিওতে তাঁকে যে সব প্রশ্ন করা হয়েছে, তার উত্তর দিয়েছেন, ইন্টারনেটে আসা প্রশ্ন, এস এম এস করে পাঠানো প্রশ্নের জবাব ও টেলিফোনে করা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, তারই সঙ্গে ছিল বিভিন্ন শহরের চলমান টেলিভিশন স্টুডিও থেকে করা প্রশ্নও. পুতিন আশ্বাস দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতির পদে তিনি আবার ফিরে এলে দেশের সঙ্গে এই কাঠামো ব্যবহার করেই সরাসরি জবাব দেবেন.