রাজনৈতিক প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে জুতো ব্যবহারের ঐতিহ্যের তৃতীয় বর্ষপূর্তি হচ্ছে. আসলে আরব সংস্কৃতিতে এই আচার পুরনো: কাউকে জুতো ছুঁড়ে মারা গুরুতর অপমানের সমান. কিন্তু উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বিতর্কের ক্ষেত্রে জুতো তিন বছর আগে মাত্র যুক্তি হতে পেরেছে – ১৪ই ডিসেম্বর ২০০৮ সালে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ জুনিয়রের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করেছিলেন ইরাকের সাংবাদিক মুন্তাজার আল-জৈদি.

    তখনকার হোয়াইট হাউসের প্রধান ও ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল- মালিকির সম্মিলিত সাংবাদিক সম্মেলনের সময়ে এই ঘটনা ঘটেছিল. জৈদি স্থির করেছিল এই ভাবে নিজের বুশের প্রতি সম্পর্ক প্রকট করবে, যিনি ইরাকের লোকেদের কাছে "সত্য গণতন্ত্রের" ব্যাখ্যা করতে এসেছিলেন, যারা ততদিনে সম্পূর্ণ ভাবেই নিজেরা টের পেয়েছিল তার রপ্তানী করা ধরনের সঙ্গে. সাংবাদিক হঠাত্ করেই নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে: "এটা ইরাকের লোকেদের কাছ থেকে উপহার, শেষ বিদায় চুম্বন" বলে মার্কিন রাষ্ট্রপতির দিকে প্রথমে একটি বুট জুতো ও তারপরে দ্বিতীয় জুতোও ছুঁড়ে দিয়েছিলেন. ছোঁড়া হাতিয়ার অবশ্য লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে নি – ব্যায়াম করা চেহারার টেক্সাসে থাকা লোক চট করে ঘুরে যেতে পেরেছিলেন. আর জৈদি হাত পিছনে মোড়া অবস্থায় মার্কিন রাষ্ট্রপতির সুরক্ষা কর্মীদের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিল. আমেরিকার নেতা ঘটনা গরম থাকা অবস্থায় সাক্ষাত্কারে অবশ্য বলেছিলেন যে, তিনি "ইরাকের এই যুবকের" উপরে কোন রকমের রাগ করেন নি. "এই রকম হয়েই থাকে, আর এর মানে হল সমাজ স্বাধীন হয়েছে", - সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন বুশ.

    এখানে বলা উচিত্ হবে যে, প্রসারিত সমাজের কাছে এই ধরনের "আলাদা সাংবাদিকতা" ভালই লেগেছিল. জৈদি রক্ষা করার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিলেন বহু সংস্থা ও আলাদা করে জনগনও, যাঁরা ইরাকে আমেরিকার সামরিক অপারেশনের সমালোচনা করেছিলেন. সহস্র ইরাকের লোক রাস্তায় নেমেছিলেন, যারা দাবী করেছিলেন জাতীয় বীরকে মুক্তি দেওয়ার. লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল সাংবাদিককে নিজেদের কর্মী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তার মাইনে দেওয়া শুরু করেছিল সেই সময় থেকেই, যখন বুশের দিকে জুতো ছোঁড়া হয়েছিল. তাকে আদালতে রক্ষা করার জন্য - একেবারেই বিনা অর্থে – এগিয়ে এসেছিলেন ইরাকের এক সবচেয়ে ভাল আইনজ্ঞ – খালিল আল- দুলেইমি, সাদ্দাম হুসেইনের প্রাক্তন আইন বিদ. ইন্টারনেটে বহু রকমের ব্যঙ্গ চিত্র দিয়ে ফ্ল্যাশ গেম বেরিয়েছিল "বুশের উপরে জুতো মারো" নাম দিয়ে. আর তুরস্কের এক জুতো কোম্পানী – যারা এই ধরনের জুতো বানিয়েছিল – তাদের আরও লোক বাড়াতে হয়েছিল এই ধরনের জুতোর বায়না সামলাতে.

    মুন্তাজার আল- জৈদি বিদেশী নেতার উপরে হামলার জন্য সাড়ে সাত বছরের জেল হতে পারতো. কিন্তু তাকে তিন বছরের জন্য জেল খাটার শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, পরে তা কমিয়ে করা হয়েছিল এক বছর, আর কয়েক মাস পরে তাকে একেবারেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল – ভাল ব্যবহারের দোহাই দিয়ে.

    রেডিও রাশিয়া এই বিখ্যাত ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজনীতিবিদদের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রশ্ন করেছিল: নতুন আমেরিকার নেতার ওপরেও একই ধরনের হামলার সম্ভাবনা কি রয়েছে? বারাক ওবামাকে জুতো ছুঁড়ে মারার মতো লোকের সংখ্যা যথেষ্টরও বেশী, এই বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতিবিদ সের্গেই মাকারভ বলেছেন:

    "প্রথমতঃ, এটা সেই সব লোকেরা, যারা ওবামার উপরে নিরুত্সাহ হয়েছেন. যারা বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনি আমেরিকাতে হয়তো কিছু পাল্টাতে পারবেন – আর এখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন যে, তিনি কিছুই করতে পারেন না. এমনকি গুয়ানতানামো জেল বন্ধ করতেও নয়. ইরাক থেকে সেনা বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ঠিকই – কিন্তু সেখানেও আফগানিস্তানের মতই দল বাড়ানো হচ্ছে. রিপাব্লিকান দলের লোকেরা মনে করছেন – ওবামা মার্কিন গরবাচভ, যে আমেরিকাকে একটা বিপর্যয়ের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে. তাছাড়া, ওবামাকে সামাজিক সক্রিয় কর্মীরা জুতো ছুঁড়ে মারতে চান, যাঁরা মনে করেন যে, ওবামার শাসন কালে আমেরিকা বিশ্ব জোড়া পুলিশের কাজ করা বন্ধ করে নি, চেষ্টা করেই যাচ্ছে সারা দুনিয়াকে একটা আমেরিকার মতো জায়গা বানানোর".

    মনে করিয়ে দিই যে, মুন্তাজার আল-জৈদি যে পদ্ধতি তিন বছর আগে নিয়েছেন তার বাস্তবতা একটুও কমে নি. চিনের প্রধানমন্ত্রী ভেন জিয়াবাও এর দিকে জুতো ছোঁড়া হয়েছে, জর্জ্জিয়ার রাষ্ট্রপতি মিখাইল সাকাশভিলি, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রেডঝেপ এরদোগানের দিকেও. ফরাসী লোকেরা বোধহয় হাতের কাছে উপযুক্ত জুতো না পেয়ে – নিজেদের রাষ্ট্রপতি নিকোল্যা সারকোজিকে প্লাস্টিকের বোতল ছুঁড়েছে. তাছাড়া, আরও অন্ততঃ দশটি জুতো ছুঁড়ে মারার মত পাগলামী তত উঁচু দরের নয় এমন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে.

    এখানে ইন্টারেস্টিং হল যে, এই "গণতন্ত্রের অস্ত্রের" লক্ষ্য কিন্তু কিভাবে যেন মুন্তাজার আল-জৈদি নিজেও হয়েছেন. প্যারিসে, ইরাকের যুদ্ধ নিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এক ইরাকের সাংবাদিক তার দিকেও জুতো ছুঁড়েছে. চিরকালীণ নীতিই এখানে কাজ করেছে: যা রোপন করবে, সেই ফসলই তুলবে.