ভারতের দক্ষিণে রাশিয়ার অংশগ্রহণে নির্মীয়মান কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের দ্বিতীয় দফার নির্মাণে, তৃতীয় ও চতুর্থ রিয়্যাক্টর স্থাপনের কাজ সংক্রান্ত চুক্তি যেমন আশা করা হয়েছে যে, এই বারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের আগামী মস্কো সফরের সময়েই স্বাক্ষরিত হতে পারে. এই বিষয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    খুবই অদ্ভূত ঠেকতে পারে যে, দুই দেশের নেতারা পারমানবিক কেন্দ্রের দ্বিতীয় দফার নির্মাণ প্রসঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে চলেছেন সেই সময়ে, যখন কুদানকুলামের সংলগ্ন অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা পারমানবিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন. তাঁরা ভয় পেয়েছেন জাপানের ফুকুসিমা - ১ পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে, যেখানে এই বছরের মার্চ মাসে ভূমিকম্প ও ত্সুনামি হওয়ার ফলে বিপর্যয় ঘটেছে. এখানের অসন্তুষ্ট লোকেদের মধ্যে স্থানীয় জেলেরাও আছেন, যাঁরা ভয় পেয়েছেন যে, পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজের ফলে জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে ও মাছ এই সমস্ত জায়গা থেকে চলে যাবে.

    এরই মধ্যে কিছুই আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটে নি. পারমানবিক শক্তির উন্নয়ন – ভারতের জ্বালানী শক্তি চাহিদা মেটানোর একমাত্র পথ. যদি আমরা পারমানবিক শক্তি উন্নয়ন না করি, তবে বিদ্যুত শক্তির অভাব পূরণ করতে পারবো না, যা দরকার প্রায় ৫০ – ৬০ হাজার মেগাওয়াট, এই কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভারতীয় রাষ্ট্র মন্ত্রী নারায়ণস্বামী. এই ধরনের মতই প্রকাশ করেছেন বহু রাজনৈতিক নেতা ও বিজ্ঞানীরা.

    প্রশাসন ব্যাখ্যা করে বলেছে যে, জাপানী "ফুকুসিমা – ১" পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছিল চল্লিশ বছরেরও বেশী আগে. সেখানে ছিল তথাকথিত ফুটন্ত রিয়্যাক্টর গুলি. এই ধরনের রিয়্যাক্টর পরিবেশে পারমানবিক বিকীরণ দূষণের বিষয়ে কম সুরক্ষিত. রাশিয়া তৈরী করে তাকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পারমানবিক কেন্দ্র ও পূর্ব নির্ধারিত চাপের মধ্যে থাকা রিয়্যাক্টর. সেখানে জল, যা টারবাইনের মধ্যে পৌঁছায়, তা পারমানবিক পদার্থের সঙ্গে সংস্পর্শে আশা জলের সঙ্গে কোন ভাবেই মেশে না. তাই রাশিয়ার রিয়্যাক্টর গুলি ফুকুসিমার রিয়্যাক্টর গুলির তুলনায়, সেই জল, যা রিয়্যাক্টরের জায়গা থেকে বের করে দেয়, তা এমনকি তাত্ত্বিক ভাবেও পরমাণু দূষণের সম্ভাবনা রাখে না, আর এখানে নিরাপত্তার মাত্রা অনেক বেশী.

    যুক্তি, জ্ঞান ধারে হলেও কাজ করে. পারমানবিক শক্তির বিরুদ্ধতা করা লোকের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে. তামিলনাডু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা, এই কিছু দিন আগেও পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে বক্তৃতা দিয়েছেন, আর এখন নিজের অবস্থান বদল করছেন. সামান্য কিছু দিন আগে এক চিঠিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে লিখেছেন যে, খুবই জরুরী ভিত্তিতে তাঁর এলাকায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত জাতীয় বিদ্যুত শক্তি ভাণ্ডার থেকে দেওয়ার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে. কুদানকুলামের প্রথম রিয়্যাক্টর ঠিক এতটাই বিদ্যুত উত্পাদনে সক্ষম, যার চালনা বন্ধ রাখা হয়েছে, তাঁরই অংশগ্রহণের মাধ্যমেও. এখন এই প্রশ্নে সোজাসুজি ব্যঙ্গ করেছে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম.

    ভারতের অর্থনীতি বাধ্য হবে পারমানবিক শক্তি বহুল পরিমানে ব্যবহার করার, এই বিষয়ে আস্থা রেখে মস্কোর জ্বালানী শক্তি ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ডিরেক্টর আন্তন খ্লোপকভ বলেছেন:

    "ভারতের কোন অন্য পথও নেই. এই ক্ষেত্রে, আমার মতে, এক রাজা সলোমনের মতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কেন্দ্র চালু করা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত রেখে, যা ভারতের নেতৃত্বকে ও পারমানবিক শক্তি পরিষদকে সামাজিক সংস্থা গুলির সঙ্গে অনেক বেশী করে আলোচনা করার সুবিধা করে দেবে ও পারমানবিক শক্তি প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে খুঁটিয়ে ব্যাখ্যা করার ব্যবস্থা করে দেবে. অন্য দিক থেকে, এটা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সুবিধা করে দেবে কেন্দ্র চালু করার বিষয়ে অনেক ভাল করে তৈরী হতে. দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এটা তো মনে হয় না ভারতের পারমানবিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কোন রকমের প্রভাব ফেলবে".

    রাশিয়া ও ভারত গত বছরের মার্চ মাসে রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের সময়ে চুক্তি হওয়া "পথ নির্দেশ" সংক্রান্ত কাজ বাস্তবায়ন করছে. এই চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে ভারত সম্মিলিত উদ্যোগে ১০০০ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন ১৪ থেকে ১৬টি রিয়্যাক্টর নির্মাণ করার কথা. কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র বিশ্বের পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র হতে চলেছে, যা ফুকুসিমা পরবর্তী সময়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মান বজায় রেখে তৈরী করা হয়েছে. এটা অনেকটাই বিশ্বের বাজারে এই ধরনের কেন্দ্রের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে. আজ রাশিয়ার "অ্যাটমস্ত্রোইএক্সপোর্ট" কর্পোরেশনের কাছে এখনই এই ধরনের ২১টি রিয়্যাক্টর ব্লক তৈরী করার বায়না পেয়েছে, এই বায়নার পরিমান গত বছরের শেষে ছিল মাত্র ১২. নতুন বায়না করেছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, চিন, বেলোরাশিয়া, আর্মেনিয়া. আলোচনা চলছে আরও ২৩টি ব্লক নিয়ে, যা অংশতঃ চেখ, মিশর, জর্ডন দেশে স্থাপন করা হতে পারে. অবশ্যই, বিপদ আছে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়েও. কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনা, তা প্রায় শূণ্যে পর্যবসিত করেছে.