রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদকে "সিরিয়া সংক্রান্ত রিপোর্ট" জমা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরব লীগ. এই সংস্থা ঠিক করেছে নিজেরাই আগে সেই দেশের পরিস্থিতি বুঝে দেখবে. রাজনীতিবিদেরা একই সময়ে সাবধান করে দিচ্ছেন যে, এখানের ঘটনা পরম্পরা সবচেয়ে ইচ্ছা বিরুদ্ধ পথেই এগোতে পারে: বাশার আসাদের প্রশাসন ধ্বংস করলে দামাস্কাসের ক্ষমতায় আসতে পারে চরমপন্থী ঐস্লামিকেরা.

    বিরোধী পক্ষ ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সিরিয়াতে বিরোধ শুরু হয়েছিল সেই বসন্ত কালে, টিউনিশিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও লিবিয়াতে শুরু হওয়া বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময়েই. ন্যাটো জোটের দেশেরা (আর তাদের ধুয়ো ধরে আরব লীগের রাষ্ট্রগুলি), আসাদের প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক যে অভিযোগ তুলেছিল, তা হল  বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা নিয়ে.

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ দামাস্কাসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নিয়েছে, তার মধ্যে অংশতঃ রয়েছে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে. তাদের উদাহরণ মেনে চলেছে আরব লীগের দেশ গুলি. আর রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ব্যবহার করে দুঃখের বিষয় বলে বিখ্যাত "লিবিয়া দলিলের" মতো সিদ্ধান্ত বহাল করতে চেয়েছিল পশ্চিমের দেশ গুলি, কিন্তু তা হতে দেওয়া হয় নি: ভেটো দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করেছে রাশিয়া ও চিন.

    নিকট প্রাচ্যে ও উত্তর আফ্রিকাতে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে, তা শুধু প্রথম দর্শনে – রাজনৈতিক শক্তি গুলির পরস্পর বিরোধ. কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এই সমস্ত প্রক্রিয়ার গভীর স্তরে লুকিয়ে রয়েছে – ধর্মীয় বিরোধ, যা পশ্চিম খুবই কৌশল করে উত্তপ্ত করে তুলেছে. সিরিয়ার ক্ষমতায় বর্তমানে রয়েছে আলাভিত (শিয়া মুসলমান ধর্ম মতের এক প্রবাহ) লোকেরা, ইরান – শিয়া মুসলমানদের দেশ. শিয়া মুসলমানের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে লেবানন ও ইরাকে, যারা প্রসঙ্গতঃ দামাস্কাসের প্রতি নিষেধাজ্ঞাতে অংশ নিতে চায় নি. তাদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে নানা রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে সুন্নী মুসলমানেরা. ধর্মীয় বিরোধ নিয়ে খালা করা হলে তা সমস্ত অঞ্চলেই বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে, এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করে সভ্যতা সহযোগিতা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভেনিয়ামিন পাপোভ বলেছেন:

    "এটা খুবই বিপজ্জনক ধারা. যদি যারা বিরোধের আগুণ জ্বালাচ্ছে, তার সমর্থ হয়, তবে আমরা অবধারিত ভাবে এমন এক পরিস্থিতির সামনে উপস্থিত হবো, যখন নতুন করে রাজনৈতিক ও ভৌগলিক সীমানা নির্ধারণের প্রয়োজন পড়বে. আর যদি সিরিয়া কয়েকটি দেশে ভাগ হয়ে যায়. তবে এর পরিনামের প্রভাব পড়বে লেবাননে, জর্ডনে, ইরাকে ও তুরস্কে. এমন আগুণ জ্বলে উঠতে পারে, যা আমরা বহু বছর ধরেই নিভাতে পারবো না. তাই এই বিরোধ নেভানোর প্রয়োজন রয়েছে একেবারে অঙ্কুরেই".

    বেশীর ভাগ বিশ্লেষকই এই মতে পৌঁছেছেন যে, "লিবিয়ার ঘটনা পরম্পরা" সিরিয়াতে হতে দেওয়া যায় না. আর বাশার আসাদের বোধহয় খুব সম্ভবতঃ টিকে থাকা হবে না: বাজী খুবই বড় মাপের. ব্যাপার হল যে, সিরিয়া – ইরানের একমাত্র সহযোগী দেশ, যার উপরে ন্যাটো জোটের মেঘ ঘনিয়েছে. আমেরিকার জন্য দামাস্কাস এই ক্ষেত্রে তেহরানে পৌঁছনোর তোরণ. যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াতে প্রশাসনকে হঠিয়ে দিতে পারে, তবে ইরান চার দিক থেকেই বেষ্টনীতে আবদ্ধ হবে.

    এটাই ওয়াশিংটন ও আরব লীগের মধ্যে হঠাত্ করে জমে ওঠা এত সংবেদনশীল পারস্পরিক বোঝাপড়ার ব্যাখ্যা হতে পারে. তাদের লক্ষ্য অন্ততঃ একটি বিষয়ে এক হয়েছে – নিকটপ্রাচ্যকে ইরানের প্রভাব মুক্ত করা, এই কথা "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করে প্রাচ্য বিশারদ ভ্লাদিমির ইসায়েভ বলেছেন:

    "এই কথা সত্য যে, সিরিয়া সব সময়েই ঘনিষ্ঠ ভাবে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে. তারা নির্দিষ্ট ভাবেই ইরানের প্রভাব আরব দেশ গুলিতে পৌঁছনোর বিষয়ে পরিবাহকের কাজ করেছে. আর এটা খুবই অসন্তুষ্ট করেছে প্রাথমিক ভাবে পারস্য উপসাগরীয় দেশ গুলিকে. তারা চেষ্টা করছে তেহরানের প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমার মতে, স্রেফ বর্তমানের পরিস্থিতিকে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করছে".

    মস্কোতে একই সময়ে আবার করে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, যে, সিরিয়া সমস্যায় নিজেদের অবস্থান পাল্টাতে রাজী নয়. বুধবারে রাশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান যেমন আবার ঘোষণা করেছেন যে, পশ্চিম বা আরব লীগের দেশ গুলির সিরিয়ার সরকারকে কোন চরম শর্ত দেওয়া উচিত নয়. সের্গেই লাভরভের কথামতো, এই বিরোধ সমাধানের একমাত্র পথ হল – এই দেশের সরকার ও বিরোধী পক্ষকে আলোচনা শুরু করার প্রয়োজন প্রমাণ করা.