ভারতের বর্তমান লোকসভাকে বলা হয়েছে ঐতিহাসিক ভাবে সবচেয়ে অসফল, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের ইতিহাসে প্রথমবার বিভিন্ন দলাদলির কারণে লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি হয়েই চলেছে.

    বি বি সি সংবাদ সংস্থার দিল্লীর সাংবাদিক সৌতিক বিশ্বাস হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, অসফল হয়েছে বর্তমানের পনেরোতম লোকসভার সমস্ত কাজের দিকই. ২০০৯ সাল থেকে কাজ শুরু করার পর থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০০টি আইন গ্রহণের জায়গায় এখন অবধি ৫৭টি গৃহীত হয়েছে. তারই মধ্যে কিছু হিসাব মতো লোকসভার প্রত্যেক দিন কাজের জন্য যদি ব্যয় হয় পঁচিশ লক্ষ টাকা তবে দেশের ক্ষতিও হয়েছে অনেক.

    ২২শে নভেম্বর শুরু হওয়া বর্তমানের অধিবেশনের থেকে অনেক আশা করা হয়েছিল, প্রথমতঃ মনে করা হয়েছিল যে সারা দেশ বাস্তবে প্রতিবাদে মুখর করে দেওয়া লোকপাল বিল, যা গান্ধী বাদী সমাজ কর্মী ও নেতা আন্না হাজারে গ্রহণের দাবী করেছেন, তা এবারে নেওয়া হবে ও তাতে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা থাকবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে. কিন্তু তাতেও বাদ পড়েছে.

    লোকসভার লোকপাল বিল আইন তৈরী পরিষদের প্রধান অভিষেক মানু সিংঘভি বলেছেন যে, আইন প্রায় তৈরীই, তবুও কিছু নিয়ম সংক্রান্ত প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে. এর অর্থ হল, শুক্রবারেই সেটি লোকসভাতে পেশ করা যেতে পারে. কিন্তু এটা বিশ্বাস করা কঠিন বলে মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "প্রথমতঃ এমনিতেই বোঝা যাচ্ছে না, কি রকম অবস্থায় এই আইন পেশ করা হবে, তাতে প্রধানমন্ত্রী সহ সমস্ত দেশের লোককে এই বিলের আওতায় আনা যাবে কি না, নাকি আগের মতই ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হবে, যা আম জনতা মানতে চায় না, বিরোধী পক্ষও এই সুযোগে আবার কাজ ভণ্ডুল করবে ও লোকসভাকে স্থগিত রাখতে বাধ্য করবে".

    বিষয় শুধু দুর্নীতি বিরোধ আইন নিয়েই নয়, এখন ভারতবর্ষের অনেক সমস্যার মধ্যে বেশী করে মাথা ছাড়া দিয়েছে রাজ্য ভাগ হওয়ার প্রচেষ্টা অন্ধ্র প্রদেশের তেলেঙ্গানা আন্দোলন মাত্রা ছাড়িয়েছে, তার পরেই মায়াবতী সরকার উত্তর প্রদেশকে আরও ছোট ভাগে ভাগ করার কথা বলছেন, সঙ্গে রয়েছে নাগা ল্যাণ্ড ও অন্যান্য প্রদেশের বিরোধের সমস্যা, যা কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করেছে, সব সময় আতঙ্কিত ভাবে তাকিয়ে থাকতে.

    আবার তার উপরে এক নতুন বিফল বিষয়, খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বড় কোম্পানীর অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আইন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বাকী জোটের দলের মধ্যেই বিরোধ, ফলে সেই বিল আনাকেই স্থগিত রাখতে হয়েছে, যদিও একমাত্র উত্তর কোরিয়া ছাড়া বোধহয় বিশ্বের সমস্ত দেশেই এখন ওয়াল মার্টের মত কোম্পানীরা কাজ করছে. ভারতের বিরোধীদের অজুহাত তাতে চাষী ও ছোট ব্যবসায়ীর ক্ষতি হয়ে যাবে, যদিও খতিয়ে দেখলে, চাষীর তাতে লাভ বই ক্ষতি কিছু হয় না, আর হ্যাঁ, অনেক পাইকারি ব্যবসায়ীও দুর্নীতি করার রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে দেখতে পারে. যখন তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে পাঁচ টাকায় জিনিস কিনে পঞ্চাশ টাকায় খুচরো ক্রেতার কাছে হাজির করতে. বিরোধী পক্ষ ও সমস্ত বিরোধীরাই এটা বোঝে, কিন্তু ভোটের সময় জনপ্রিয় হওয়ার জন্য আর নিজেদের দলের জন্য কালো টাকার যোগান বজায় রাখার জন্যই বিরোধিতা করছে. এই কথা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও খাটে. সেখানে মুখ্যমন্ত্রী এখন ঢং দেখাচ্ছেন যে, তিনি এই আইনের বিরুদ্ধে, মা, মাটি ও মানুষের পক্ষে. কিন্তু যে মানুষ পরিশ্রম করে উত্পাদন করে তাকে ঠকিয়ে তিনি বোধহয় ধোঁকাবাজ ফড়ে দের পক্ষ নিচ্ছেন. স্রেফ আমি বীরত্বের কাজ করেছি, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গিয়েছি বলে লোকের কাছে প্রচারের অপচেষ্টা চলছে. আর কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আরও একটা কালো বল পাঠানো হয়েছে.

মনে হচ্ছে, আলাদা করে কিছু বিষয়ে মতান্তরই এখানে মুখ্য নয়, সারা দেশেই লোকে চাইছে, বর্তমানের নেতাদের দূর করে দিয়ে, নতুন ধরনের বেশী বাস্তব বাদী ও কম ক্ষমতা লোভী নেতৃত্ব পেতে. তাতে যদি বর্তমানের প্রশাসনকে বলি দিতে হয়, তাতেও তৈরী. তাই এই সব ব্যাপার সময়ের আগেই লোকসভা নির্বাচনে বাধ্য করতে পারে, যদি না বর্তমানের প্রশাসন ইঙ্গিত বুঝে নিজেরাই ক্ষমতার উচ্চ মহলে পরিবর্তন আনেন. যত বেশী দিন বর্তমানের নেতারা এই বিষয়টাকে আটকে রাখার চেষ্টা করবেন, তত দূরেই তারা ক্ষমতা থেকে ছিটকে যেতে পারেন বলে রুশ বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন.