আগামী সপ্তাহে বন শহরে শুরু হতে যাওয়া আফগানিস্তান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তান ঠিক করেছে যাবে না. গত শনিবারে ভোর রাতে আফগান সীমান্তের কাছে পাকিস্তানের সীমান্ত চৌকিতে ন্যাটো জোটের তরফ থেকে গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে. আকাশ পথে হামলায় নিহত হয়েছেন কম করে হলেও ২৪ (২৫) জন পাক জওয়ান. বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    বন শহরের সম্মেলনকে ইসলামাবাদের তরফ থেকে বয়কটের সিদ্ধান্তে কাজের খুবই ক্ষতি হবে. পাকিস্তান ছাড়া আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনার কাজে সাফল্য আসতে পারে না. পাক আফগান সীমান্তের বিস্তৃতি, সীমান্তের দুই পারেই ঐতিহ্য অনুযায়ী পুস্তুন প্রজাতির বহু মানুষের আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতি, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবে এই অঞ্চলের উপরে প্রভাব ফেলে থাকে.

    আশা করা হয়েছে যে বন সম্মেলনে আফগানিস্তান আগামী এক বছরের পরিকল্পনা পেশ করবে, যা দেশের স্থিতিকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার কাজে ব্যবহার করা হবে, মাদক ও দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইকে নিয়ে করা হবে ও দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করবে. কিন্তু পাকিস্তানের তরফ থেকে যে কোন ধরনের বিষয়ে অবস্থান জানা না থাকলে, তা অর্থহীণ হয়ে যেতে পারে.

    ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে প্রজাতি অধ্যুষিত এলাকায় সীমান্ত চৌকিতে আকাশ পথে আঘাত পাকিস্তান ও পশ্চিমের সম্পর্কের মধ্যে এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, আর খুবই জটিল করে দিয়েছে আফগানিস্তানে শান্তিপূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে – এই কথা উল্লেখ করে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের নিকট প্রাচ্য সমস্যা বিশ্লেষণ কেন্দ্রের প্রধান আলেকজান্ডার শুমিলিন বলেছেন:

    "সব দিক বিচার করে দেখা গিয়েছে, যে এটা ভুল করে আঘাত হানা হয়েছে, কিন্তু তার পরিনাম খুবই গুরুতর. তার ওপরে এটা ন্যাটো জোটের বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে খুবই স্পর্শকাতর এলাকায় করা প্রথম ভুল নয়, যেখানে তালিবদের প্রভাব খুবই বেশী.পাকিস্তানে বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী ওসামা বেন লাদেনকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অতর্কিতে খুন করে আসার পরে পাকিস্তানের লোকেদের সহ্য ক্ষমতাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে এই নতুন আঘাত. পাকিস্তানের সরকার ঘোষণা করে দিয়েছে যে, তারা খুবই গুরুতর ব্যবস্থা নেবে. এখানে একটু অন্যভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে, বন শহরে আফগানিস্তানের জন্য আবার অনুদানের ব্যবস্থা করতে হত, আর সেখানে একবার আইন শৃঙ্খলা স্থাপিত হলে, মার্কিন মুলুক ও আরব মুলুক থেকে নিয়ন্ত্রিত বিশাল মাদক ব্যবসায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারতো. এখন বন শহরে কোন আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে আরও এক বছর বর্তমানের মাত্সান্যায় চালিয়ে যাওয়া যবে ও আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মার্কিন সংরক্ষণশীল দলের লোকেরা এই বিষয় ব্যবহার করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে. তাদের নিজেদের প্রয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জায়গাতেই অশান্তি, যাতে সেখানে নির্বাধ ভাবে নিজেদের কুকীর্তি চালিয়ে যাওয়া যায়. চিন ও পাকিস্তানেরও এই এলাকায় শান্তি না ফিরলে লাভই হচ্ছে, এই সুযোগে যত রকমের নতুন অস্ত্র তৈরী হচ্ছে, তার পরীক্ষা হবে ও মার্কিন অস্ত্রও চিনের পক্ষে হাতে পেয়ে নকল করতে সুবিধা হবে. সুতরাং একসাথে অনেক লাভ. রাশিয়ার পক্ষ থেকে আপাততঃ সব দেখে যাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই. চিন এখানে রাশিয়াকে ঢুকতে দিতে চায় না, যদিও গত বছর গুলিতে রাশিয়া পাকিস্তানকে অনেক বিষয়ে সাহায্য করেছে, মূলতঃ ভারতবর্ষে রুশ অস্ত্র ব্যবসা কমে আসছে বলেই. মনে রাখতে হবে নিকট প্রাচ্য, মধ্য ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা যত অস্থিতিশীল হবে, ততই লাভ বেশী হবে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী দেশ গুলির. আর সেখানে কাণ্ডারীর ভূমিকা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই নিয়ে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার শঠ বুদ্ধির যোগানদার গ্রেট ব্রিটেন. তার ওপরে বর্তমানে ভারতকেও তার ভূমিকা থেকে দূরে রাখার জন্য বিশ্বে জারী করা প্রয়োজন সশস্ত্র যুদ্ধ, অহিংস আন্দোলন বা নির্জোট আন্দোলন নয়".

    তাই পাকিস্তানের বেলুচিস্থানে শামসি বিমান বন্দর খালি করে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চলে যেতে বলে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আগামী বছরের জন্য নিজেদের মার্কিন মোটা অঙ্কের অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থাই করছে. সোনায় সোহাগা হয়েছে করাচী থেকে আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের রসদ পাঠানোর পথ ও পাক কোম্পানীদের পক্ষ থেকে জ্বালানী পাঠানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া. আফগানিস্তানে কোন রেল পথ নেই, তাই সড়ক বন্ধ হওয়া মানে সেনা বাহিনীকে অসুবিধায় ফেলা, অর্থাত্ বাড়তি চাপ সৃষ্টি. নতুন পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিনা রব্বানি এবারে তাঁর রূপ গুণ সমস্ত ব্যবহার করে, পাক বাজেটের কত গুণ বেশী অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের কাছ থেকে আগাম হিসাবে নিতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়. মার্কিন সরকারও বসে নেই, তারা হিসাব করছেন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া ট্রানজিট ব্যবহার করে রসদ পাঠাবার খরচের কত অংশ পাকিস্তানকে এই স্ক্যাণ্ডাল মিইয়ে দেওয়ার জন্য দিয়ে কাজ হাসিল করা যেতে পারে.

    পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর নেতৃত্বের প্রতিনিধি মেজর জেনেরাল ইসহাক নাদিম এই আকাশ পথে আক্রমণ কে বলেছেন আগ্রাসন বলে, আর পদাতিক বাহিনীর প্রতিনিধি আখতার আব্বাস বলেছেন যে, এটার পরিনাম খুবই গুরুতর হতে পারে. এখন প্রশ্ন হল এই সমস্ত ঘোষণার ফলে কত ডলার দাম বাড়বে আফগানিস্তানের সন্ত্রাস বিরোধী অপারেশন ও মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের গণতন্ত্র মোহাবিষ্ট জনসাধারনের পকেট কেটে কত বেশী পাক ও তালিব কর্তা ব্যক্তিদের ধন সম্পদ বৃদ্ধি সম্ভব হবে.

    ন্যাটো জোটের নেতৃত্ব প্রথমে খুব করে ক্ষমা চেয়ে সস্তায় এই বিপদ থেকে উদ্ধার চেয়েছিল, কিন্তু ২৪টি পাক জওয়ানের প্রাণের দাম অত্যন্ত ন্যায় নিষ্ঠ পাক ও তালিব নেতারা, যারা ভারতের মুম্বাই শহরে নিরপরাধী ১৬৬ টি প্রাণ নাশের জন্য একদল সন্ত্রাসবাদীকে তালিম দিয়ে পাঠিয়েছিল ও এখনও সেই সব লোকেদের প্রশিক্ষণ দাতা চাঁইদের নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে, তারা এই বারে বাগে পেয়ে ছেড়ে দেবে না. আফগানিস্তানের সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান আফগান মানুষেরাই করতে পারেন, তার জন্য বিশ্ব জোড়া সম্মেলনের কোনও প্রয়োজন নেই, এই কথা আফগানিস্তানের মানুষদের যোগ্য নেতৃত্ব যে দিন ক্ষমতায় এসে বুঝবেন ও বোঝাবেন, সেদিনই অন্ততঃ এই এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে. আপাততঃ পাক ও তালিব নেতাদের দেখানো ভয় যে, মার্কিন সেনা বাহিনী চলে গেলেই আফগানিস্তানে রক্তের নদী বইবে, তা দিয়ে দেখা যাক কত বেশী ডলার পাওয়া যেতে পারে, পাক কর্তাদের ব্যক্তিগত সুখ সুবিধার বিকাশের জন্য.