২০১২ সালের অলিম্পিকের অর্থ যোগান দাতাদের তালিকা থেকে ভারতবর্ষের খেলোয়াড়েরা ডো কেমিক্যালস কে বাদ দেওয়ার দাবী করেছেন. তাঁরা মনে করেন যে, এই বহুজাতিক সংস্থার একটি শাখা – আমেরিকার কোম্পানী ইউনিয়ন কার্বাইড ভারতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রযুক্তি বিপর্যয়ের জন্য দায়ী, যা ভোপাল শহরের ১৯৮৪ সালে হয়েছিল. খেলোয়াড়দের সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

    এর মধ্যেই প্রায় ২৭ বছর কেটে গিয়েছে, যখন আমেরিকার ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানীর ভোপাল শহরের কীটনাশক প্রস্তুত করার কারখানায় বিপর্যয় হয়েছিল, তার পর থেকে, কিন্তু ভারতীয় দের হৃদয় থেকে তার ব্যথা আজও রয়ে গিয়েছে. এই ব্যথা আরও তীব্র হচ্ছে, যত বেশী দিন সেই ঘটনার পর চলে যাচ্ছে. কারণ বাস্তবে এই বিপর্যয়ের জন্য দোষী অপরাধীরা শাস্তি পায় নি, যে সমস্ত লোকের কাজে ঢিলেমি ও চোখ খোলা না রাখার জন্যই এটা ঘটেছিল. কারখানাতে বিপর্যয়ের ফলে বিষাক্ত গ্যাসের দূষণে সেই সময়ে ও তারপরে অসুখে সর্বমোট মৃত লোকের সংখ্যা কম করে হলেও হিসাব করা হয়েছে ২৫ হাজার মানুষ. মৃত ও ক্ষতিগ্রস্থদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আজ অবধি দেওয়া হয় নি. প্রায় পাঁচ লক্ষ লোক আজও বিভিন্ন নিয়মিত ফিরে আসা অসুখে ভুগছেন, যার কারণ রাসায়নিক বিষ. ভোপাল শহরের ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে চোখে পড়ে জন্মের সময় থেকেই অসুস্থ খুবই বেশী সংখ্যায় শিশু.

    ভোপাল ট্র্যাজেডি নিয়ে তদন্তের জের চলেছে বহুদিন ধরেই. ভারতের সরকার তখন দাবী করতে চেয়েছিল আমেরিকার কোম্পানীর প্রধান আমেরিকার নাগরিক ওয়ারেন অ্যান্ডারসন কে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই বিষয়ে অস্বীকার করেছে. ২০১ সালে ভারতের বিচারালয় এই কারখানার প্রাক্তন ভারতীয় ডিরেক্টর জগন্নাথ মুকুন্দ সহ আরও সাতজন পরিচালককে অসাবধানতার কারণে মৃত্যুর কারণ হওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেকের জন্য দুই বছরের হাজতবাস শাস্তি ঠিক করেছিল. কিন্তু তারা মাত্র আড়াই হাজার ডলারেরও কম জরিমানার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল. ভারতের হাইকোর্ট এই শাস্তির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, দোষীদের মাত্র দুই বছরের সাজা হওয়ার বিষয় আবার বিচার করে দেখবে ও শাস্তি কঠোর করা হবে. কিন্তু এখনও সরকারি ভাবে এই মামলার বিচার করা হয় নি.

    সম্ভবতঃ, এই কারণেই ভারতের বাইশ জন খেলোয়াড়ের এক দল, যাঁরা ভারতবর্ষের হয়ে অলিম্পিকে যাবেন প্রতিনিধিত্ব করতে, দাবী করেছেন ডো কেমিক্যালস কোম্পানীকে লন্ডনের আগামী বছরের অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অনুদান দাতার ভূমিকা থেকে বিরত করতে. তাঁরা ১৬ই নভেম্বর বুধবারে চেন্নাই শহরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে খেলোয়াড়েরা জানিয়েছেন যে, তাঁরা অলিম্পিক কমিটির কাছে আবেদন করেছেন ডো কেমিক্যালস কোম্পানীকে দাতা তালিকা থেকে বাদ দিতে. সাংবাদিকদের কাছে ভারতীয় হকি দলের তারকা খেলোয়াড় বাসুদেবন ভাস্করণ বলেছেন যে, "অলিম্পিকের প্রধান লক্ষ্য হল – বিশ্বের স্বাস্থ্যকে ভাল করার, আর এই সম্বন্ধে তাঁর দুঃখ হয়েছে যে, সেই ধরনের কোম্পানী, যেমন ডো, অলিম্পিকের অনুদান দাতা হতে পারছে ভেবে". এই হকি দলের অন্য এক সতীর্থ খেলোয়াড় সৈয়দ আলি বলেছেন যে, "ডো কোম্পানী অলিম্পিকের স্পনসর হলে, অলিম্পিকের আত্মাই অপমানিত হয়". ভারতীয় প্রাক্তন খেলোয়াড়েরা, যাঁদের বেশীর ভাগ ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিকে সোনার পদক জিতেছিলেন, তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, লন্ডন অলিম্পিকের সঙ্গে ডো কেমিক্যালস কোম্পানীর কোন সম্পর্ক থাকবে না. ভারতীয় অলিম্পিক কমিটির সভাপতি বি. কে. মালহোত্রা ঘোষণা করেছেন যে, ভারতীয় অলিম্পিক কমিটি এই সম্বন্ধে কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেবে.এই ধরনের দৃষ্টিকোণ রাশিয়ার বহু খেলোয়াড়েরা ও ক্রীড়া প্রেমীরা মেনে নিয়েছেন. রাজনৈতিক অনুসন্ধান কেন্দ্রের ডিরেক্টর সের্গেই মার্কভ উল্লেখ করে বলেছেন:

    "ডো কেমিক্যালস কে অলিম্পিকের স্পনসর হওয়ার মতো মর্যাদা অবশ্যই দেওয়া উচিত্ হবে না. অলিম্পিকের খেলা দিয়ে প্রমাণ করা উচিত্ যে, এটা কোন ব্যবসা নয় যেখানে যে কোন ধরনের নোংরা অর্থ নিতে পারা যায়, সেটা স্বাস্থ্য ও সুন্দরের উত্সব".

    বলা হয়ে থাকে যে, খেলা রাজনীতির বাইরে. কিন্তু এটা দুমুখো প্রশ্ন. সুস্থ জীবন যাপন, ন্যায় ও খেলাধূলার প্রচার – রাজনীতির অংশ মাত্র. সুতরাং এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মৌল খেলাধূলাতেও রয়েছে. বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক চিত্রে ক্ষমতাসীন জাতীয় কংগ্রেস দল খুবই চাপের মধ্যে রয়েছে, তাই বিরোধী পক্ষ এই বিষয়কেও সরকারের উপরে বাড়তি চাপ সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করছে. একটা কথাই শুধু মনে রাখলে হয় ১৯৮০ তে মস্কো অলিম্পিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বহু দেশ বয়কট করে ও ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলস্ অলিম্পিক সোভিয়েত দেশ সহ বহু দেশ বয়কট করে খেলাধূলার উত্সবকেই ম্লান করেছিল ও অলিম্পিক গেমসকে প্রায় ধ্বংসের মুখে টেনে এনেছিল. তাই ভলখোনস্কি লিখেছেন যে, ভারতের বোধহয় উচিত্ হবে না এই অলিম্পিক থেকে নিজেদের অংশ গ্রহণ বাদ দেওয়া. এমনিতেই জনা পঞ্চাশের ভারতীয় দল খুব বেশী পদকের আশা নিয়ে লন্ডন রওয়ানা হবে না.