এই বছর দশম বছর যখন থেকে গোল্ডম্যান স্যাক্স ব্যাঙ্কের অর্থনীতিবিদ জিম ও নিল প্রথম চারটি সবচেয়ে দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতির দেশের নাম সংক্ষেপ করে ব্রিক (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন) নামে উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, একবিংশ শতকের মাঝামাঝি এই দেশ গুলি সম্মিলিত জাতীয় বার্ষিক উত্পাদনের হারে বড় সাত দেশকে ছাপিয়ে যাবে.

    এটা হঠাত্ করেই হয়েছে অথবা তা নাও হতে পারে যে, এই দশম বার্ষিকীর বছরেই ও নিল নিজের একটি নতুন বই বের করেছেন নাম দিয়েছেন "উন্নতির মানচিত্র: ব্রিক দেশ গুলি ও তার বাইরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা", এর কিছু অংশ গ্রেট ব্রিটেনের "ডেইলী টেলিগ্রাফ" সংবাদপত্র প্রকাশ করেছে.

    লেখক লিখেছেন – "একমাত্র যে বিষয়ে আমার অনুশোচনা হচ্ছে, তা হল নিজের ২০০১ সালের বিশ্লেষণে আমরা যথেষ্ট সাহসী ছিলাম না".

    আসলে, তখন অনেকের কাছেই কল্প কথা মনে হয়েছিল যে, সেই সমস্ত দেশের অর্থনীতি, যেমন রাশিয়া, ভারত বা চিন কোন নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রগুলির জন্য প্রতিযোগী হতে পারবে. আরও কম বাস্তব মনে হয়েছিল যে এই রকম চারটি খুবই বিভিন্ন দেশের পক্ষে কোন রকমের রাজনৈতিক জোট তৈরী করা সম্ভব হবে. এই তো মাত্র তিন চার বছর আগেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে এমনকি এই ধরনের ধারণাও প্রচলিত ছিল যে, "ব্রিক – এটা একটা বুদ্ধিজীবি তৈরী করা ভূত". কিন্তু বাস্তব দেখা গেল অনেক সাহসী, জিম ও নিল করা সমস্ত পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশী, এই কথা উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

    "আজ বিশ্বে বার্ষিক উত্পাদনের ক্ষেত্রে চিন, জাপানকে পেরিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, তাদের আগে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র. তার ওপরে, অনেক বিশেষজ্ঞই যেমন পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, বছর কুড়ি পরেই (ও নিল এমনকি নির্দিষ্ট সাল তারিখও লিখেছেন – ২০২৭ সালের মধ্যে)চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে যাবে ও বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশে পরিনত হবে. ২০৩০ সাল নাগাদ অনেক অর্থনীতিবিদ ভারতকে বিশ্বের বার্ষিক জাতীয় উত্পাদনে দ্বিতীয় স্থানে দেখতে পেয়েছেন. তার সঙ্গে ব্রিকস জোটের সমস্ত দেশ গুলিতেই ২০০৮- ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রভাব কম হয়েছে, কৃত্রিম ভাবে ফুলিয়ে রাখা উন্নত দেশ গুলির বুদ্বুদের মতো অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফেটে যাওয়ার তুলনায়, যেখানে সঙ্কট তো শেষ হয়ই নি, বরং আরও বেশী করে দ্বিতীয় বার ঢেউ নিয়ে আসতে চলেছে".

    ব্রিক দেশ গুলির এই ক্ষেত্রে পারস্পরিক ভাবে যোগাযোগ রেখে কাজ করা আরও বেশী করে লক্ষ্যনীয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে (এই বছরের বসন্ত কাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার যোগদানের ফলে ব্রিক থেকে ব্রিকস জোট হয়েছে). ব্রিকস কোন রাজনৈতিক বা সামরিক জোট নয়, তা স্বত্ত্বেও এই বেসরকারি ক্লাবের সদস্য দেশ গুলি একসাথে আর এক মেরু বিশিষ্ট বিশ্ব মেনে নিতে রাজী নয় ও পশ্চিমের বৃহত্ রাষ্ট্র গুলির নির্দেশ মানতেও আর চায় না, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের. আর জনপ্রিয়তার দিক থেকে ব্রিকস নিয়ে এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাস্তবে গ্রীসে যখন জন প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল, তখন অনেক মিছিলেই স্লোগান উঠেছিল – "ইউরোপীয় সঙ্ঘ ত্যাগ করো, ব্রিকসে যোগ দাও".

    ও নিল লেখা বইয়ের যে সব অংশ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে, এটা এই প্রক্রিয়ার মোটেও অন্ত নয়, যা তিনি দশ বছর আগে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, এই কথা উল্লেখ করে ভলখোনস্কি লিখেছেন:

    "ও নিল প্রস্তাব করেছেন ব্রিক দেশ গুলিকে (তিনি এখনও তাঁর নিজের দেওয়া নামে কিছুতেই দক্ষিণ আফ্রিকা দেশকে জুড়তে তৈরী নন) আর উন্নতিশীল অর্থনীতি বলতে তৈরী নন, তার জায়গায় তিনি নাম দিতে চান বর্ধনশীল বা বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি. তার ওপরে ব্রিকস (চলুন আমরা তাও এই নামকরণ কারীকে সমালোচনা করে বর্তমানের স্বীকৃত নামটিই ব্যবহার করবো) দেশ গুলি এখন উন্নত দেশ গুলির তথাকথিত বড় সাতটি দেশের ক্লাবকেই আর মেনে নেওয়ার মতো বলে মনে করতে চাইছেন না. কারণ এখন বড় সাত তৈরী হলে, সেখানে চিনকে থাকতেই হয়, আর সমস্ত ব্রিক জোটের দেশই এখন কানাডার জাতীয় উত্পাদনকে পেছনে ফেলে দিয়েছে. এই প্রসঙ্গে ব্রাজিল বর্তমানের বিশ্বে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ইতালি এমনকি গ্রেট ব্রিটেনকেও পেছনে ফেলে. তার ওপরে বড় সাত দেশের তিনটি দেশ জার্মানী, ফ্রান্স ও ইতালি – তাদের একটাই মুদ্রা, ইউরো, তাই লেখক বড় সাত দেশের তালিকায় এদের আলাদা করে উপস্থিতিকেও সন্দেহের বলে মনে করেছেন আলাদা ভাবে. আর পরবর্তী তালিকায় রয়েছে অনেক নতুন অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ দেশ, যাদের সংখ্যা প্রতি বছরের সঙ্গেই বাড়ছে, আর যারা প্রতিযোগিতা শুরু করেছে নতুন ব্রিকস নামে পরিচিত হওয়ার জন্য".

    এই সমস্ত দেশ গুলির জন্য গোল্ডম্যান স্যাক্স কোম্পানীর বিশ্লেষকেরা নাম বার করেছেন এন – ১১ (আগামী – ১১, নেক্সট এগারো). এই দলে সেই সমস্ত দেশ রয়েছে যেমন বাংলাদেশ, ইজিপ্ট, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, নাইজিরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইনস, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম, এদের অনেকেই অল্প কিছু দিন আগে পরিচিত ছিল একেবারেই আশাহত ভাবে পেছিয়ে পড়া দেশ বলে, আর কিছু দেশ (যেমন, ইরান) পশ্চিমের হিসাবে ছিল তাড়িয়ে দেওয়া দেশ বা দুর্বৃত্ত দেশ. এখান থেকে সিদ্ধান্ত কি হতে পারে তা দেখাই যাচ্ছে: বিশ্ব আজ থেকে দশ বছর আগে যে রকমের ছিল, তা আর কখনও থাকবে না বা হবেও না, আরও বেশী করে নতুন দেশ উঠে আসছে ও আসবে, যারা ছোট্ট একদল উন্নত দেশের নির্দেশ মানতে চাইবে না, বরং তাদের জন্য বাস্তবে তৈরী করে দেবে প্রতিযোগিতার আসর – সে যেমন অর্থনীতির ক্ষেত্রে, তেমনই রাজনীতিতে.