"দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে বলতে পারেন না যে, আমার তাঁর কথা জানার কথা নয়". "দস্তয়েভস্কি অবধি সকলেরই কিছু না কিছু পৌঁছনোর রাস্তা রয়েছে: কারণ কেউই নিজের আত্মার প্রতি নৈর্ব্যক্তিক হয়ে থাকতে পারে না", - এই কথা লিখেছেন আজ থেকে একশ বছর আগে রুশ দার্শনিক ভাসিলি রোজানভ. কিন্তু আজও তাঁর এই পর্যবেক্ষণকে কেউই বোধহয় তর্কের প্রসঙ্গ করতে পারবে না.

    "রাশিয়া" টেলিভিশন চ্যানেলে লেখকের সম্বন্ধে এক জীবনী সংক্রান্ত কাহিনী চিত্র আটটি পর্যায়ে দেখানো নিয়ে বিগত কয়েক মাস ধরেই এক তর্কবিতর্ক চলছে. সম্ভবতঃ, কারণ হল যে, "দস্তয়েভস্কি" নামের এই পর্যায়ক্রমিক চিত্রের মূখ্য স্রষ্টারা – এঁরা চিত্রনাট্যকার ও নাট্যকার এডুয়ার্ড ভলোদারস্কি ও চলচ্চিত্রকার ভ্লাদিমির খোতিনেঙ্কো – ঠিক করেছিলেন যে, তাঁরা দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে এক মূর্তি সুলভ প্রতিচ্ছবি তৈরী থেকে বিরত হয়ে সেই মূখ্য বিষয়টিকেই তুলে ধরবেন, যা লেখকের অবিশ্বাস্য রকমের ঘটনাবহুল ও একেবারেই নাটকীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি হতে পারে, যার সম্বন্ধে আধুনিক মানুষকে জানানো দরকার. হতে পারে সেই সম্বন্ধেও বোধহয় বলা দরকার, যা বিদ্যালয়ের সাহিত্যের পাঠ্য বিষয়ে কখনও অন্তর্ভুক্ত হয় নি? অথবা দর্শককে চমক দেওয়ার মতো কিছু করা বোধহয় দরকার?- ভ্লাদিমির খোতিনেঙ্কো মনে করে দেখেছেন, যে তাঁর মনেও এই রকমের প্রশ্নের উদয় হয়েছিল, কিন্তু তিনি পরে বুঝেছিলেন যে, এটা – মিথ্যা প্রচেষ্টাই হবে.

    "সত্য করে বলতে হলে, আমি বলতেও পারবো না, দস্তয়েভস্কি বা তাঁর সময় সম্বন্ধে আমরা কি জানতাম না. সকলেই তো জানত যে, তিনি জুয়াড়ী ছিলেন? নিশ্চয়ই জানতেন. অথবা, আমরা কি আর জানতাম না যে, তিনি মৃগী রোগে ভুগতেন? – অবশ্যই জানতাম.তাঁর মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টাও চেষ্টা করা হত এড়িয়ে যাওয়ার. কিন্তু কোন কিছুই একেবারে গোপনীয় ছিল না. আবার অন্য দিক থেকে, আমি এই কাজ হতে নিয়েছিলাম শুধু এই কারণেই: যে বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমি দস্তয়েভস্কির সম্বন্ধে কিছুই জানি না. এইটাই আমার জন্য সব চেয়ে আগ্রহের হয়েছিল. দস্তয়েভস্কির সম্বন্ধে অনেক রকমের চলচ্চিত্র তোলা সম্ভব, এমনকি একশটা পর্যায় ধরেও তোলা সম্ভব, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও – যা সম্পূর্ণ করে আয়ত্ত্ব করা যায় না, তা যাবেও না".

    ফলে এই আত্মজীবনী মূলক কাহিনী চিত্রের বিষয় হয়েছে ফিওদর দস্তয়েভস্কির জীবনের ৩০টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বছর. এর কাহিনী শুরু হয়েছে সেই সময় থেকে যা একেবারেই অন্য দিকে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তাঁর জীবনকে – তথাকথিত জনসমক্ষে হত্যার অভিনয় ও ২৮ বছরের লেখককে তাঁর বৈপ্লবিক বিশ্বাসের জন্য নির্বাসিত অবস্থায় চার বছরের কঠোর সশ্রম কারাদণ্ড. আর তা শেষ হয়েছে সেই সময়ে যখন দস্তয়েভস্কি বহু বিখ্যাত অবস্থায় নিজের শেষ বৃহত্ উপন্যাস- "কারামাজোভ ভাইয়েরা" লেখার সূচনা করছেন. তিরিশ বছরের মধ্য দিয়ে চলা সময়ের অন্তর্নিহিত যোগসূত্র – তিন মহিলার প্রতি ভালবাসা: যাঁরা আলাদা হলেও সকলেই ছিলেন একই রকমের শক্তিশালী চরিত্রের ও যাঁদের এই চারিত্রিক শক্তির উল্লেখ লেখকের সৃষ্টির পাতায় আজও অমর হয়ে রয়েছে.

    এই টেলিভিশন সিরিয়ালের বেশীর ভাগ অংশই তোলা হয়েছে জার্মানীর ওয়েইসবাডেন শহরে (ফ্রাঙ্কফার্টের কাছে). এক সময়ের সারা ইউরোপের এই বিখ্যাত উষ্ণ প্রস্রবনের সাথে জড়িত স্বাস্থ্যোদ্ধার কেন্দ্রে, কারণ দস্তয়েভস্কি তাঁর জীবনের এই সময়ের বেশীর ভাগ সময়ই কাটিয়েছিলেন এখানে ও ক্যাসিনো খেলার বেশীর ভাগটাই এখানে হয়েছিল – এই ধরনের একটা ধারণাই এই জায়গা নিয়ে রুশ লোকেদের মনে রয়েছে. সঠিক ভাবেই জানা রয়েছে যে, দস্তয়েভস্কি এক নাছোড়বান্দা জুয়াড়ী হয়েও এই শহরেই তাঁর জীবনের শেষ জুয়ার দান দিয়ে হেরেছিলেন ও আবারও কপর্দক শূণ্য হওয়ার পরে ঠিক করেন যে, আর জুয়া খেলবেন না, পরে আর খেলেনও নি. তাই বাস্তবেই ওয়েইসবাডেন শহরে সিরিয়ালের অনেকটাই তুলতে হয়েছে.

    এই প্রসঙ্গে খোতিনেঙ্কো তাঁর এই শহরের সঙ্গে সোভিয়েত দেশ অবসানের পরবর্তী সময়ে পরিচয়, একই ক্যাসিনো যাওয়া, সেখানে জুয়া খেলে জেতা ও তা দিয়ে দলের লোকেদের ভোজ খাওয়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন. তাঁর মনে হয়েছে এই ক্যাসিনো দেখা ও অনুভবে বোঝা যে, এখানে এক সময়ে দস্তয়েভস্কি হেরেছিলেন, তা খুবই উদ্বুদ্ধ করেছিল কারণ দস্তয়েভস্কি শেষ বার হারার পরে সকলে মিলে, বিশেষত স্থানীয় অর্থোডক্স গির্জার পোপের উদ্যোগে অর্থ জোগাড় করে তাঁকে ঋণ মুক্ত করে দেশে ফেরত পাঠাতে হয়েছিল, আর খোতিনেঙ্কো সেখানেই জিতে যেন একটা ঐতিহাসিক অন্যায়ের বদলা নিতে পেরেছেন.

    ১৯০ তম জন্মদিনে দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে আরও একটি চলচ্চিত্র তোলা হয়েছে রুশ চলচ্চিত্রকার মিখাইল মামুলিয়া দস্তয়েভস্কির "অপরাধ ও শাস্তি" উপন্যাসের আদর্শে "নির্বাচিত" নামে এক সিনেমা তুলেছেন. এখানে দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের ছাত্র রদিওন রাসকোলনিকোভ এক অপরাধী বলেই শুধু পরিচয় পায় নি. কারণ আধুনিক চলচ্চিত্রকার বলেছেন- "দস্তয়েভস্কির তৈরী ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে বর্তমানে আটকে রাখা যায় না, কারণ সময় পাল্টে গিয়েছে, তার সঙ্গে পাল্টেছে প্রতীক ও সঙ্কেত গুলিও".

    "রাসকোলনিকোভ বহুমাত্রিক চরিত্র. এর মধ্যে যেমন রয়েছে খুনী চরিত্র, যে অপরাধ করার পরে নিজেকে বিশ্ব ও জগতের থেকে আলাদা করে ফেলতে চায় এমন ভাবে, যেন কাঁচি দিয়ে নিজের চারপাশকে কেটে ফেলা হচ্ছে, তেমনই আরও একটা মাত্রা রয়েছে যখন দুঃস্বপ্ন রাসকোলনিকোভ চরিত্রকে তাড়া করে ফিরছে".

    "টমাস মানের উপন্যাস রয়েছে "নির্বাচিত" নামে, সেখানেও এই উপন্যাসের আদলে কাহিনী, যেখানে পবিত্র আত্মার চারপাশেই রয়েছে অপরাধ ও পাপ. মামুলিয়া বলে চলেছেন যে, যে মানুষ অপরাধ করে ফেলার পরে নিজেকে বাস্তব থেকে স্বেচ্ছা বিতাড়িত করে ও এক ধরনের ঘূর্ণিপাকে পড়ে ও যার তলায় যেন অকূল সমুদ্রের তলায় ডুবে যায়, সেখান থেকে একমাত্র আত্ম শক্তিতেই নিজেকে পরিবর্তিত করে ও অভিযোজিত করে শুদ্ধ হয়ে আবার উঠে আসতে পারে – যেন অনুভব, বিদ্যুতের মত শক্তি ও গতি সম্পন্ন প্রবল চাপের মধ্য থেকে উঠে আসা – সেই লোককেই বলা যেতে পারে নির্বাচিত. এই নামই রাসকোলনিকোভ সম্বন্ধে নেওয়া যেতে পারে, নায়ক সমস্ত রকমের হৃদয়ের ঘূর্ণাবর্ত থেকে, অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসো নতুন আলোকে".

    রাশিয়ার বাইরেও লেখকের ১৯০ তম জন্মদিনকে পালন করা হয়েছে. রেপ্লিকা বা প্রতিচ্ছবি নামের মাদ্রিদের ড্রামাটিক্যাল থিয়েটারে এই বছর পালন করা হয়েছে দস্তয়েভস্কির বছর বলে. এখানে মঞ্চস্থ করা হয়েছে "শ্বেত রাত্রিগুলি" ও "মহান জল্লাদ" নামের দুটি নাটক – যে দুটিকে একসাথে করে দুই অঙ্কের এক নাটক করা হয়েছে, কুশীলবদের অভিনয় সারা ইউরোপে সাড়া জাগিয়েছে. এই থিয়েটারের জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকে সহযোগিতা পরিষদ পাঠিয়েছে দস্তয়েভস্কির জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে এক ফোটো প্রদর্শনী ও কয়েক মাস ধরে দেখানো হয়েছে লেভ কুলিঝানোভের বিখ্যাত কাহিনী চিত্র "অপরাধ ও শাস্তি".

    ফিওদর দস্তয়েভস্কির সৃষ্টির প্রতি মনোযোগ শুধু এই বছরের উল্লেখ যোগ্য দিন বলেই দেওয়া হয় না. সারা বিশ্বের শিল্পী নাট্যকার ও বুদ্ধিজীবিরা তাঁর প্রতি মনোযোগ অবিরতই দিয়ে আসছেন. যেমন বিশ্বের চলচ্চিত্র প্রেমী লোকেদের কাছে প্রখ্যাত এমির কুস্তুরিত্সা তাঁর "আমার বন্ধু ফিওদর" নামের উপন্যাস শেষ করেছেন এই ভাবে যে, এক পরিচালক "অপরাধ ও শাস্তি" নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে অর্থাভাবে দ্বারস্থ হয়েছেন অনেকের কাছে, তাঁর সাহায্য জুটছে এই ভাবে যে, তাঁকে অর্থ দিতে চাওয়া হয়েছে খুনের মূল্য হিসাবে.

    "আমার নায়কের সামনে সেই রকমেরই নির্বাচনের মুহূর্ত এসেছে – অপরাধের বিনিময়ে ভাল কাজ করতে পারার পরিস্থিতি, যেমন ছিল রাসকোলনিকোভের সামনে. কিন্তু বর্তমানের নায়ক আর কোন দোনামনায় ভুগতে চায় না, কারণ এ অন্য সময়ের, অন্য সামাজিক গঠনে অভ্যস্ত".

     বিখ্যাত পোলিশ পরিচালক আঞ্জেই ভাইদা বহুবার দস্তয়েভস্কির উপন্যাস "অপরাধ ও শাস্তি" এবং "ইডিয়ট" নাটকের আদর্শে "নাতালিয়া ফিলিপোভনা" নামের নাটক মঞ্চস্থ করেছেন, সিনেমাও তুলেছেন. তিনি "পাপী (বেসী)" নামের উপন্যাস নিয়ে এক সময়ে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি তিনি এই নিয়ে সিনেমাও তুলেছেন, পোল্যান্ডে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও রাশিয়াতে নাটক করেছেন (মস্কোর "সভরেমেননিক" – সমসাময়িক নামের থিয়েটার হলে). ভাইদা "দস্তয়েভস্কি: বিবেকের থিয়েটার" নামে এক বইও লিখেছেন. এই বইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল – দস্তয়েভস্কির নায়কদের আত্ম কথোপকথন.

    "তাঁর উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝেছি যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – কথোপকথন. দস্তয়েভস্কিকে নষ্ট করা সম্ভব একমাত্র চরিত্রদের নিজেদের সঙ্গে নিজেদেরই কথোপকথন কম করে দিয়ে. আর এখন অবধি বেশী বাস্তব বা বেশী গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গিয়েছে দস্তয়েভস্কির চরিত্রদের দোনামনা ভাব, যা তারা চেষ্টা করেছে সমাধানের ও আত্ম কথনের মাধ্যমে তুলে ধরেছে", - বলেছেন ভাইদা.

    জাপানের লেখক হারুকি মুরাকামি খুবই প্রভাবিত হয়েছেন দস্তয়েভস্কির থেকে.

    ""কারামাজোভ ভাইয়েরা" উপন্যাসের মতো কিছু একটা সম্পূর্ণ ধরনের সৃষ্টি করবার জন্যই আমি লিখতে শুরু করেছি", - বলেছেন তিনি.

    প্রত্যেকেই এই সব বইয়ের লেখকের কাছে যাওয়ার জন্য নিজের আলাদা চাবির সন্ধান করে থাকে, যা আজ দেড়শ বছরেরও বেশী সময় ধরে মানব সমাজ পড়ে চলেছে. আর মনে হয়, এই রকমই সব সময়ে হতে থাকবে. যেন রুশ কবি ইনোকেন্তি আন্নেনস্কি যেমন বলেছেন: "দস্তয়েভস্কি পড়ুন, দস্তয়েভস্কি ভালবাসুন, - যদি পারেন, আর না পারলে, দস্তয়েভস্কিকে গালি দিন, তবুও পড়ুন..."