জাপানের পারমানবিক বিদ্যুত উত্পাদন কেন্দ্র ফুকুসিমাতে বিপর্যয়ের পরে বিশ্বের শক্তি ভারসাম্যে পারমানবিক শক্তি ক্ষেত্রের দ্রুত পতন সংক্রান্ত নৈরাশ্যবাদী পূর্বাভাস স্বত্ত্বেও এই শিল্প ক্ষেত্র প্রভূত উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে. আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার রিপোর্টে এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়েছে. বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

আগামী ২৫ বছরে বিশ্বের শক্তি উত্পাদনের ক্ষেত্রে পারমানবিক শক্তির অংশ শতকরা সত্তর ভাগ বেড়ে যাবে, যা ফুকুসিমার ঘটনার পূর্বে করা অনুমানের চেয়ে খুবই সামান্য কম, - উল্লেখ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার রিপোর্টে. রিপোর্টের লেখকেরা সাবধান করে দিয়েছেন যে, পারমানবিক শক্তি থেকে বিরত থাকার প্রচেষ্টা প্রবল ভাবে বাড়িয়ে দেবে খনিজ জ্বালানী – তেল, গ্যাস ও কয়লার চাহিদা. ফলে সেই গুলির দাম বাড়বে প্রচুর ও দ্রুত. দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতির দেশ গুলিতে বিদ্যুত শক্তির চাহিদা মেটানো দুষ্কর হবে. যেখানে বিদ্যুত উত্পাদনের কেন্দ্র গুলিতে প্রাকৃতিক রসদ থেকে উত্পাদন করা হয়ে তাকে, সেখানে সবসময়েই ক্রয় করে যেতে হবে, এই কথা উল্লেখ করেছেন ফরাসী পারমানবিক বিজ্ঞানী ব্রুনো কোম্বি. যদি পারমানবিক শক্তি ব্যবহার করা হয়, তবে বড় মাপের বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হবে শুধু পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করতে, আর পরবর্তী কালে বিনিয়োগ বাস্তবে হয়ে দাঁড়াবে শূণ্য.

খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারটি. সর্বাধুনিক প্রজন্মের পারমানবিক রিয়্যাক্টর গুলি কোন রকমের পরিবেশ দূষণের উপকরণ ছড়ায় না ও খুবই ভরসা যোগ্য ভাবে সুরক্ষিত, যা অন্যান্য শক্তি উত্পাদনের পদ্ধতি সম্বন্ধে বলা যেতে পারে না, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পারমানবিক সংগঠনের কার্যকরী ডিরেক্টর পাভেল ইয়াকভলেভ বলেছেন:

"পারমানবিক শক্তি শিল্প আবহাওয়াতে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের বর্জনের উত্স নয়. আর দ্রুত পরমাণু বিভাজনের স্বল্প শক্তি সম্পন্ন থোরিয়াম রিয়্যাক্টর গুলির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই আস্থা সহকারে বলা যেতে পারে যে, এটা একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় "সবুজ" শক্তি উত্পাদনের প্রযুক্তি".

রুশ পারমানবিক শক্তি শিল্প ক্ষেত্র বিশ্বের একটি নেতৃস্থানীয় শিল্প, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি গত ও প্রকল্প নির্মাণ ও রিয়্যাক্টর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়, পারমানবিক জ্বালানী প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও বিরলতম. আমাদের খুবই উচ্চ প্রশিক্ষিত কর্মীরা রয়েছেন. রাশিয়া নিজেদের দেশে ও বিদেশে একই সঙ্গে অনেকগুলি পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করছে – তার মধ্যে ভারতবর্ষে, চিনে, তুরস্কে, ভিয়েতনামে ও অন্যান্য দেশে. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার ভূমিকা বাড়তেই থাকবে: এটা দেখা যাচ্ছে এখনই পারমানবিক প্রযুক্তি শিল্পে উন্নত দেশ গুলির মধ্যে সবচেয়ে গতিশীল সূচকের উন্নতি দিয়ে.

ভারত, সেই সমস্ত দেশের একটি, যাদের সঙ্গে রাশিয়া সবচেয়ে বেশী করে সহযোগিতা করে আসছে ও শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তির বিকাশেও. কুদানকুলাম পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রে ফুকুসিমা পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুটি এক হাজার মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন রিয়্যাক্টর চালু করার কাজ শেষ হতে চলেছিল. কিন্তু জাপানের পারমানবিক কেন্দ্র বিপর্যয়ের ফলে উদ্ভূত ভীতি থেকে স্থানীয় জনসাধারনের বিরুদ্ধাচরণের ফলে এই পারমানবিক কেন্দ্রকে বর্তমানে কয়েক মাসের জন্য চালু হওয়া থেকে স্থগিত রেখে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে. কিন্তু ভারত পারমানবিক শক্তি ছাড়া উন্নতি করতে পারবে না, এই কথা মনে করে মস্কোর শক্তি ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ডিরেক্টর আন্তন খ্লোপকভ বলেছেন:

"ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে পারমানবিক শক্তির প্রভূত ব্যবহার করতে বাধ্য. ভারতের অন্য কোন পথও নেই. এই প্রসঙ্গে, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, এক কিং সলোমনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই কেন্দ্র চালু করা স্থগিত রেখে, যা ভারতের প্রশাসন ও পারমানবিক শক্তি পরিষদকে সুযোগ দেবে আরও বেশী করে সামাজিক সংস্থা গুলির সঙ্গে পরামর্শ করার ও খুবই খুঁটিয়ে পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন গুলি ব্যাখ্যা করার. অন্য দিক থেকে প্রযুক্তি বিশারদ দের পারমানবিক শক্তি কেন্দ্র চালু করার আগে আরও সময় রয়েছে সব দেখে শুনে করার. সমস্ত রকমের প্রয়োজন থাকা স্বত্ত্বেও ভারতের মতো বড় দেশের জন্য অন্যান্য শক্তি উত্স যেমন, সৌর শক্তি, বায়ুর শক্তি, বিভিন্ন ধরনের জৈব উত্সের শক্তি ও সেই সমস্ত গুলি থেকে পাওয়া শক্তির পরিমান খুবই নগণ্য হবে".

কিন্তু ফুকুসিমার মতো ট্র্যাজেডি কি এড়ানো সম্ভব ছিল? সন্দেহ নেই যে, ছিল. কারণ এই পারমানবিক কেন্দ্র তৈরী হয়েছিল ৪০ বছরেরও আগে. সেখানে তথাকথিত ফুটন্ত রিয়্যাক্টর গুলি লাগানো ছিল. সেই গুলি দামে সস্তা, গঠন বেশী সহজ. এই ধরনের রিয়্যাক্টর পরিবেশে নির্গত হতে পারে এমন পারমানবিক বিকীরণ থেকে কম সুরক্ষিত. রাশিয়া তৈরী করে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির পারমানবিক রিয়্যাক্টর, যেই গুলি চাপের মধ্যে থাকে. তার ভিতরের জল, যা টারবাইনের কাছে যায়, তা পরমাণুর সঙ্গে যে জল সংস্পর্শে এসেছে তার থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা. তাই রুশ রিয়্যাক্টর গুলিতে ফুকুসিমার রিয়্যাক্টরের তুলনায় যে জল রিয়্যাক্টর এলাকা থেকে বাইরে বের হতে পারে, তা এমনকি তাত্ত্বিক ভাবেও বিকীরণের দ্বারা দূষিত হতে পারে না.