পাল তোলা নৌকা ডেলটা বিশ্ব পরিক্রমার ইউরোপীয় অংশ সমাপ্ত করেছে. পিছনে রয়ে গিয়েছে পুরাতন বিশ্বের বারোটি দেশ, বাল্টিক ও উত্তর সাগর, ইংলিশ চ্যানেল ও বিস্কে উপসাগর. সামনে - অতলান্তিক মহাসমুদ্র. রুশ নাবিকেরা তিন বছরেরও কম সময়ে আশা করেছেন বিশ্ব পরিক্রমা শেষ করার. এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য – রাশিয়ার উপগ্রহ ব্যবস্থা গ্লোনাসস সারা বিশ্বের সমস্ত জায়গায় কি রকম কাজ করে তা পরীক্ষা করে দেখা.

    সুন্দরী পাল তোলা নৌকা ডেলটা দীর্ঘ সময়ের বিশ্ব পরিক্রমা শুরু করেছিল এই বছরে রুশ স্বাধীনতা দিবস ১২ ই জুন, ক্রেমলিনের দেওয়ালের পাশ থেকে আর ক্রাইস্ট দ্য সেভিয়ার গির্জার পূত ঘন্টা ধ্বনির মধ্যে. এই নৌকায় জল, খাবারের ও ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া রয়েছে নিজস্ব বিপদ সঙ্কেত পাঠানোর রেডিও ও সামুদ্রিক বয়া, যা মহাকাশ থেকে লক্ষ্য করে প্রয়োজনে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজে লাগতে পারে. নতুন রুশ যন্ত্রপাতি নৌকার নাবিকেরা পরীক্ষা করেছেন উন্মুক্ত সমুদ্রে, তার মধ্যে রুশ গ্লোনাসস দিক নির্দেশ ব্যবস্থাও রয়েছে. ডেলটা পাল তোলা নৌকার মালিক ও ক্যাপ্টেন আন্দ্রেই নেভজোরভ "রেডিও রাশিয়াকে" বলেছেন:

    "যেমন পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের বাবারা ইউরি গাগারীনের প্রথম মহাকাশ যাত্রা নিয়ে গর্ব বোধ করতেন, তেমনি আমরাও এখন গর্ব বোধ করছি যে, আমাদের দেশ মহাকাশের কক্ষপথে খুবই শক্তিশালী উপগ্রহের দল পাঠিয়ে দিক নির্দেশের ব্যবস্থা করতে পেরেছে. আমাদের সমস্ত জায়গাতেই আমরা গ্লোনাসস দিক নির্দেশ ব্যবস্থা ব্যবহার করে চলেছি ও এর সম্ভাবনা নথিবদ্ধ করেছি. বলা উচিত্ হবে যে, রুশ দেশের ভিতরের মতোই ইউরোপে এমন একটি জায়গাও নেই, যেখানে এই ব্যবস্থা কোন রকম গণ্ডগোল করেছে".

    মস্কো চ্যানেল থেকে এই তিরিশ ফুটের নৌকা বেরিয়ে পড়েছিল ভোলগা নদীতে ও গিয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ অবধি. উত্তরের রাজধানীতে শেষ হয়েছিল যন্ত্রপাতি শেষ অবধি লাগিয়ে ফেলা ও আরও একবার গ্লোনাসস ব্যবস্থার পরীক্ষা, তারপরে আন্দ্রেই নেভজোরভ বলেছেন:

    "পিটার্সবার্গের পরে আমরা তিনটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশে গিয়েছি – ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও ডেনমার্ক, তারপরে লাতভিয়া ও পোল্যান্ড, কিল উপসাগর দিয়ে বাল্টিক সমুদ্র থেকে বেরিয়ে গিয়েছি উত্তরের সাগরে. আমরা তারপরে নেদারল্যান্ড পার হয়েছি, আমস্টারডম শহরে গিয়েছি. বেশ কয়েকটি ফরাসী বন্দর ছুঁয়ে আমরা ব্রিটেনের দ্বীপপূঞ্জে পৌঁছেছি, সেখান থেকে বিস্কে উপসাগর দিয়ে বেরিয়ে পার হয়ে উষ্ণ স্পেনে পৌঁছেছি. স্পেনের সমুদ্র তীর হয়ে আমরা পৌঁছেছি নীচে, পর্তুগাল দেশে, আর এখন আমরা রয়েছি লিসাবন শহরে".

    এই পথের একাংশ নৌকার নাবিকদের সাথে চলেছিল এক হুলো বেড়াল, তার নাম দেওয়া হয়েছিল গ্লোনাসস, যেটাকে হঠাত্ই রাশিয়ার ভোলগা তীরের উগলিচ শহরে নৌকায় তুলে নেওয়া হয়েছিল. কিন্তু হতাশার বিষয় হল যে, এই গ্লোনাসস বিড়ালের আর বিশ্ব পরিক্রমা করা সম্ভব হল না. বেড়াল এক ফরাসী বন্দরে আরেকটা সুন্দরী বিড়ালকে দেখে তার কাছে নেমে চলে গিয়েছে. আন্দ্রেই বলেছে যে, সমস্ত উত্তর সাগরেই তাদের নৌকার পাশেপাশে চলেছে ডলফিনের দল. এখন নৌকা যাবে দক্ষিণের পথে, মরক্কো, মাডেইরা, ক্যানারি দ্বীপপূঞ্জ – কাবো ভার্ডের দ্বীপ গুলির দিকে.

    ৪৩ বছরের ক্যাপ্টেন ও ডেলটা নৌকার মালিক আন্দ্রেই নেভজোরভ পাল তোলা নৌকা নিয়ে চলার অভিজ্ঞতা রাখেন ২৫ বছরের. বর্তমানের অভিযানে তাঁর সহকারী সঙ্গী হয়েছেন স্ত্রী এলেনা. আর যদিও শুরু থেকে পাঁচ মাস সময়ের মধ্যে নেভজোরভ পরিবারের দুই জনই তাঁদের মোট শারীরিক ওজনে পনেরো কিলোগ্রাম ঝরিয়ে ফেলেছেন, তবুও তাঁরা খুবই খুশী আছেন. গ্লোনাসস ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্ব পরিক্রমার এই পরিকল্পনা ইউনেস্কোর "পালের তলায় সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য" নামের প্রকল্পের অংশও বটে. এই তিরিশ হাজার সামুদ্রিক মাইল বা ৫৫ হাজার কিলোমিটার বিশ্ব পরিক্রমার পথে ডেলটা নৌকা শুধু ইউরোপের বন্দরেই যাবে না, যাবে ভারতের, অস্ট্রেলিয়ার, ক্যারিবিয়ান উপসাগরের দেশ গুলিতে এবং ওশেনিয়ার দেশ গুলিতেও, যেখানে তাঁরা দেখবেন ইউনেস্কো উল্লিখিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দ্রষ্টব্য গুলি.