ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে বর্তমানে উত্তেজনা আরও একবার তুঙ্গে উঠেছে. আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা নিজেদের আরও একটি "অতি গোপন" রিপোর্ট প্রকাশ করেছে. এই ঘটনার চারপাশ জুড়ে তথ্যের পারিপার্শ্বিক আগে থেকেই তৈরী করা হয়েছিল: প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে এই রিপোর্টের আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যাওয়া বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে রয়েছে তেহরানের জন্যই খারাপ সিদ্ধান্ত. এর মধ্যেই দুই বহু দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইজরায়েল ও ইরানের রাষ্ট্রপতিরা একে অপরের উপরে বক্তব্য দিয়ে আক্রমণ করতে পেরেছেন. প্রসঙ্গতঃ আহমাদিনিজাদ ও পেরেস নিজেদের ঘোষণাতে সেই সমস্ত ধারণাকেই ভিত্তি করেছেন, যেমন "যুদ্ধ" ও "বোমা আঘাত".

আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এই প্রথম সরাসরি ঘোষণা করছে যে, ইরানকে পারমানবিক বোমা বানানোর বিষয়ে সন্দেহ করা হচ্ছে. এই দলিলে বলা হয়েছে যে, ইরান গোপনে যন্ত্রপাতি ও দলিল যোগাড় করেছে, যা দিয়ে পারমানবিক বোমা বানানো যেতে পারে, কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুদ্ধাস্ত্রের মডেল পরীক্ষাও তারা করেছে. এই সমস্ত তথ্য অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে. এর উত্স নিয়ে কোন রকমের তথ্য দেওয়া হয় নি. শুধু জানানো হয়েছে যে, এই তথ্য আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সদস্য দেশ গুলির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে.

মস্কোতে এই প্রসঙ্গে হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, কিভাবে এই সংস্থা তাদের রিপোর্টকে জনসমক্ষে এনেছে, তা নিয়ে. এই দলিল সেই সমস্যার চারপাশ ঘিরে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে, যা ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে এমনিতেই ছিল, এই কথা উল্লেখ করে রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি আলেকজান্ডার বোলদারেভ বলেছেন:

"ভিয়েনা শহরে সরকারি ভাবে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সদস্য দেশগুলির মধ্যে রিপোর্ট পাঠানোর আগেই এটি হয়েছে এক অনুমান, শোনা কথা ও রাজনৈতিক কানাঘুষো তৈরীর উত্স, যা অবশ্যই তাদের জন্য কোন রকমের সম্মান বৃদ্ধির বিষয় হচ্ছে না, যারা চারপাশ ঘিরে তথ্যের ভুয়া বিশ্লেষণ আগে থেকেই ছড়িয়ে রাখে. আমাদের প্রাথমিক প্রশ্ন হবে প্রথমতঃ এটা জানা যে, এই সংস্থার সম্পাদনা বিভাগ কতটা নিজেদের কাজ নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখতে পারে, যেটা না থাকলে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাজের মধ্য দিয়ে উপস্থিত সমস্যা সমাধানই প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়. বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিয়ে পেশাদারী ভাবে এই তথ্য নিয়ে আলোচনার অনেক আগেই, যা সাধারণতঃ করা হয়ে থাকে সভ্য সমাজে, এই তথ্যের চারপাশে গোলমাল জেনে বুঝেই শুরু করা হয়েছিল".

তেহরানে অবশ্যই আরও কঠোর ভাবে মন্তব্য করা হয়েছে. এই সংস্থার কাজকে সেখান থেকে বলা হয়েছে অপেশাদার ও রাজনৈতিক ভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত. আর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান ইউকিও আমানো – আমেরিকার হাতের পুতুল, ঘোষণা করেছেন মাহমুদ আহমাদিনিজাদ, তিনি বলেছেন:

"আমার জন্য এটা দুঃখের বিষয় যে, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাজ পরিচালনা করেন এমন একজন লোক, যাকে ওয়াশিংটন থেকে কার্যভার দেওয়া হয়েছে. এই সংস্থা আর নিরপেক্ষ নেই. আর এখন এমনকি নিজেদের জিনিসপত্রও রক্ষা করতে সক্ষম নয়. আমেরিকার লোকেরা স্রেফ কিছু দলিল জাল করে সংস্থার প্রধানকে দিয়ে দিয়েছে".

এই প্রকাশনার আগে সমস্ত পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার কাজের শৈলীর সঙ্গে মেলে না, এই কথা উল্লেখ করেছেন রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে মস্কোর কার্নেগী সেন্টারের বিশেষজ্ঞ পিওতর তোপীচকানভ, তিনি বলেছেন:

"রাষ্ট্রসঙ্ঘের এক বিভাগের মত এই সংস্থা, যাদের জেনে শুনে গোপনীয় বিষয় ফাঁস করা স্বাভাবিক কাজের ধরনের মধ্যে পড়ে না. এটা সাধারণতঃ সেই সমস্ত রিপোর্টের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে, যা বিভিন্ন দেশের দপ্তরে তৈরী করা হয়ে থাকে. অংশতঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যখন সেখানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও গুপ্তচর বিভাগ কোন রিপোর্ট তৈরী করে থাকে, তা আগে থেকেই সংবাদ মাধ্যমে চলে আসে. আর যখন একটা উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরী করা যায়, তখনই এই ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়ে থাকে".

মনে করিয়ে দিই যে, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়েই আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার প্রধান এই রিপোর্ট প্রকাশ সম্বন্ধে আগাম জানানি দিয়েছিলেন. রাশিয়া ও চিন তখনই ইউকিও আমানো কে সতর্ক করে দিয়েছিল "ভিত্তিহীণ তাড়াহুড়ো" করার দরকার নেই বলে ও আহ্বান করেছিল "সাবধানে কাজ কর্ম করতে". মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের পক্ষ থেকে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল. যা, সেই রকমই ভাবা উচিত্, তারা নিজেরাই আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার প্রধানের হাতে তুলে দিয়েছিল – কোন রকমের সঠিক প্রমাণ ছাড়াই. ফলে, বিশেষজ্ঞরা যে রকম মনে করেছেন, স্ক্যাণ্ডাল তৈরী করা দলিল, যা এক মর্যাদাময় আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম করে প্রকাশ করা হয়েছে, তা কোন নতুন বাস্তব প্রমাণই ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে, যা আগে থেকেই জানা রয়েছে, তার থেকে বেশী কিছুই যোগ করতে পারে নি. কিন্তু এবারে এই সংস্থার কিছু কর্মচারীর কাজের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে.