গত সপ্তাহের শেষে যে ঘটনা ঘটেছে ও যার প্রধান ভূমিকায় ছিলেন ভারতীয় সাংবাদিক ও ভারতে চিনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ইয়ান, তা এখনও নানা রকমের মানে করার জন্য ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে, যা খুবই গুরুতর ভাবে ভারত ও চিনের এমনিতেই অস্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে প্রতিফলিত হতে পারে.

    বিগত বৃহস্পতিবারে ঝ্যাং মহাশয় এক ভারতীয় সাংবাদিককে খুবই নোংরা ভাবে উত্তর দিয়েছেন, যিনি চেষ্টা করছিলেন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে ভারতের এক মানচিত্র নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার, যেখানে চিনের একটি বড় ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা কোম্পানী তাদের এক বিজ্ঞাপনের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে. এই মানচিত্রে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যকে দেখানো হয়েছে চিনের অংশ হিসাবে আর পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অংশকে পাকিস্তানের সীমানার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে. সাংবাদিক, পরে যেমন রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, "এক কথা বারবার বলে বিরক্ত করছিল, ফলে রাষ্ট্রদূতের সহ্য ক্ষমতা অতিক্রান্ত হয়েছিল ও তিনি সাংবাদিককে বলেছেন চুপ করে যেতে".

    এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য মুহূর্ত রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

"প্রথমতঃ, সমস্ত ভারতীয় পর্যবেক্ষকেরাই যেমন একসাথে উল্লেখ করেছেন যে, সাংবাদিকদের সঙ্গে এই ধরনের ব্যবহার চিনের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক হতে পারে, তাদের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যমের লোকেদের জন্য, কিন্তু ভারতে তা চলতে পারে না. "রাষ্ট্রদূত বোধহয় ভুলে গিয়েছেন যে, তিনি জীবন্ত গণতন্ত্রের দেশে কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন, যেখানে সংবাদ মাধ্যম স্বাধীন ও সরকারি প্রশাসনের অংশ নয়, যারা বিভিন্ন দলের নেতাদের হুকুমে ওঠে বসে". এই রকম ঘোষণাই করেছেন এই প্রসঙ্গে দেশের প্রধান বিরোধী দলের অর্থাত্ ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারি মুখপাত্র তরুন বিজয়.

দ্বিতীয় অদ্ভূত ব্যাপার হল ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি প্রতিক্রিয়া. পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমন্ত্রী গৌতম বাম বাওয়ালে প্রথা গত ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মানচিত্রের এই ধরনের অঙ্কনের বিরুদ্ধে, কিন্তু উল্লেখ করেছেন যে, সরকারি ভাবে ব্যাখ্যা তিনি ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছেন যে, এটা ভুল করে করা হয়েছে ও তা শীঘ্রই ঠিক করা হবে.

তৃতীয় অদ্ভূত ব্যাপার হল, এই ঘটনা ঘটেছে এমন এক সভায়, যেখানে চিনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরী এক শক্তি কোম্পানী টি বি ই এ ভারতের গুজরাট রাজ্যের সঙ্গে সেখানের নেতৃত্বের উপস্থিতিতে এক পারস্পরিক সমঝোতা পত্রে স্বাক্ষর করার উত্সব করছিল, যেখানে বিনিয়োগের কথা হয়েছে চিনের পক্ষ থেকে এই রাজ্যে প্রায় ভারতীয় টাকায় ২৫০০ কোটি বা পঞ্চাশ কোটি ডলার বিনিয়োগের. এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, এই দ্রুত উন্নতিশীল রাজ্যে বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে সেই বি জে পি দল ও যে ন্যাশনালিস্ট দলের সম্ভাবনা রয়েছে আগামী লোকসভা নির্বাচনে দেশে প্রশাসনের ক্ষমতায় আসা ও এই দলের হয়ে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামী সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলেও ভাবা হচ্ছে. বি জে পি দল প্রায়ই নিজেরা চিন বিরোধী কথাবার্তা বলে থাকে ( এই বারেও চিনের রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া সমালোচনাই তারা করেছে), আর প্রশ্নটি ঠিক এই ভাবেই হচ্ছে: কোনটা বেশী প্রয়োজনীয়, বড় মাপের চিনে বিনিয়োগ, নাকি দলের নীতি অনুসরণ করা. আপাততঃ শ্রী মোদী নিজের দিক থেকে এক প্রতীকী উদ্যোগ দেখিয়েছেন. এই সপ্তাহে তিনি চিনের সরকারের আমন্ত্রণে চলেছেন সেই দেশ সফরে, তবে আগেই জানিয়েছেন যে, সেখানে তাঁর যাওয়ার সমস্ত খরচ তিনি অতিথি হলেও নিজেই বহন করতে ইচ্ছুক.

আর শেষ ব্যাপার হল, এই উত্সবের এক প্রদান অতিথি ছিলেন চিনের সিনজিয়ান প্রদেশের (সিনজিয়ান উইগুর স্বয়ং শাসিত অঞ্চল) রাজ্যপাল নুর বেকরি. খুব ভাল করেই জানা রয়েছে যে, চিনের সিন জিয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে নিজেদেরই যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে. আর তাই আগ্রহের বিষয় হল: চিনের সরকারি মহল কি রকমের প্রতিক্রিয়া দেখাতেন যদি কোন মানচিত্রে এই অঞ্চলকে দেখানো হত চিনের সীমানার বাইরে? – রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ এই রকমের একটি প্রত্যুত্তরে প্রশ্নও রেখেছেন".

আসলে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনায় যেন এক জলের কণাতেই ভারত – চিনের সম্পর্কের সমস্ত বিরোধ ফুটে উঠেছে. দেশের সর্ব্বোচ্চ স্তরে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক একেবারেই মিত্র সুলভ. কিন্তু যে সমস্ত বিরোধ রয়েছে, তা ঢাকা দেওয়া সম্ভবই হচ্ছে না – সেই গুলি নেই মনে করলেও আবার ফুটে বেরোচ্ছে. কিন্তু ফলে সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠছে স্পষ্টই এখনকার জন্য যা প্রয়োজন আর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে লাভের প্রশ্ন: যখন বাজী রাখা হয়েছে এত অর্থের, তখন নীতিগত ভাবে বিরোধের কথা বোধহয় ভুলে গেলেও চলে.