৪ঠা নভেম্বর রাশিয়াতে জনগনের ঐক্য দিবস পালিত হচ্ছে. এই রাষ্ট্রীয় উত্সবের দিন পূর্বপুরুষদের বাণীর প্রতি বিশ্বাসের প্রতীক, যাঁরা ১৬১২ সালে, পারস্পরিক বিরোধ ও অরাজকতা পার হয়ে, দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় যুদ্ধ জয় করেছিলেন বিদেশী আগ্রাসীদের তাড়িয়ে. তাঁদের উদাহরণ আজও প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার ভবিষ্যত জনগনের ঐক্যে ও একজোট হওয়ার উপরেই নির্ভর করছে.

    ১৬১২ সালে সারা রাশিয়াই ছিল এক যুদ্ধ ক্ষেত্র. পশ্চিমের অধিকাংশ এলাকাই দখল করে নিয়েছিল যুযুধান প্রতিবেশীরা. মস্কো অধিকার করেছিল পোলিশ অনুপ্রবেশকারীরা. ঐক্যবদ্ধ রুশ রাষ্ট্রের কার্যত পতন হয়েছিল, জারের শূণ্য আসন দখলের জন্য বহু স্বঘোষিত শাসকের উদয় হয়েছিল. রাশিয়া, বহু শতকের ইতিহাসে প্রথমবার নিশ্চিহ্ণ হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছিল. এই রকমের জাতীয় ট্র্যাজেডির সামনে নিজের ইতিহাসে আর কখনও উপস্থিত হতে হয় নি, বলা যেতে পারে, এর আগে বা পরে কখনোই নয়, এই কথা উল্লেখ করে রুশ ইতিহাস ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর আন্দ্রেই সাখারভ বলেছেন:

    "ঐতিহাসিক ভাবে সেই কঠিনতম দুর্যোগের সময়ে, যখন মতবিরোধের চূড়ান্ত সময়ে, আত্মিক ভাবে শূণ্য পরিস্থিতিতে ও সমাজের নীতিগত অধঃপতনের মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতা ও নিজের স্বার্থকেই ভালবাসা রুশ জাতিকে নিহত করতে চেয়েছিল, তখনই তার মধ্যে থেকে উঠে এসেছিল জনগনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভাল গুণ গুলি. কৃষকের শক্তি, ব্যবসা ও শিল্পের কাজে নিযুক্ত স্তরের শক্তি, যোদ্ধা ও জমিদারী স্তরের শক্তি – সেই সমস্ত মানুষের শক্তি, যাঁরা রুশ দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, যাঁরা শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের অন্বেষণেই ব্যস্ত ছিলেন না. তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রচুর. এঁরা ছিলেন রুশ ও ভোলগা পারের প্রতিনিধি, উত্তরের লোক ও তাঁরা ছিলেন বহু রকমের ধর্ম মতের ধারক. এটা ছিল সেই জনগন – যাঁদের পুরোধা ছিলেন খুবই উজ্জ্বল পুরুষেরা – মিনিন ও পঝারস্কি. এই মানুষেরাই ভিনদেশী আগ্রাসীদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন. তাঁরা নিজেদের জন্মভূমিকে ভালবেসে ছিলেন ও তা রক্ষাও করেছিলেন".

১৬১২ সালের ৪ঠা নভেম্বর মস্কো শহরকে দখলদার থেকে জনতার বাহিনী মুক্ত করেছিল. সতের শতকের মাঝামাঝি থেকেই রুশ রাজধানী স্বাধীন হওয়া উপলক্ষে প্রতি বছরে ৪ঠা নভেম্বর পালিত হত কাজান শহরের মাতা মেরির আইকনের উত্সব, যা রুশ বাহিনী সামনে নিয়ে দখলদার মুক্ত রাজধানীতে প্রবেশ করেছিল. বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত শাসনের সময়ে সর্ব জাতীয় উত্সব করার এই ঐতিহ্য ভঙ্গ হয়েছিল. কিন্তু ২০০৫ সালে আবার করে এই রাষ্ট্রীয় উত্সব পালন করা শুরু হয়েছে, আর ক্যালেণ্ডারে এই দিনটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে জন ঐক্য দিবস হিসাবে.

কিন্তু জাতীয় জনমত গ্রহণের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, এই উত্সব সরাসরি ভাবে এখনও সমস্ত জাতির উত্সবে পরিনত হতে পারে নি, কারণ রুশ সমাজের কিছু অংশ এখনও সোভিয়েত সময়ের উত্সব ৭ই নভেম্বরকেই বেশী মর্যাদা দিয়ে থাকে. যাতে এই উত্সব প্রত্যক্ষ অর্থেই সারা জাতির উত্সবে পরিনত হয়, তার জন্য অনেক সময় লাগবে, এই কথা মনে করে রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর লিওনিদ রেশেতনিকভ বলেছেন:

"যখন দেশে বিপ্লব হয়েছিল, তখন থেকেই ৭ই নভেম্বর পালন করা শুরু হয়েছিল. বহু দশক ধরে জনগনকে এই উত্সব পালন করতে শেখানো হয়েছে. শেখানো হয়েছে চুপ করে থাকতে ও তার প্রতি কোনও সমালোচনা না করতে. আর যদি সমালোচনা কেউ করতো, তবে তার জন্য জেলেও পাঠানো হয়েছে. এখন আমরা খুব শান্ত ভাবেই আলোচনা করি: ৪ঠা নভেম্বর উত্সব কি না? মুখ্য হল – এটা পুনর্জন্ম হওয়া রাশিয়ার চারপাশে এক জোট হওয়া. এই মহান ধারণাই জনগন ধীরে হলেও গ্রহণ করতে শিখছে".

রাশিয়ার ধর্মীয় নেতারা, যাঁদের উদ্যোগে ৪ঠা নভেম্বরের উত্সবের পুনর্জন্ম হয়েছে, তাঁরা দেশবাসীকে এই দিনটিকে ভাল কাজের দিন হিসাবে পালন করতে বলেছেন, যখন বিভিন্ন প্রজাতির মানুষ, তাঁদের ধর্ম বিশ্বাস ও বিভিন্ন সামাজিক দলের লোক হিসাবে নিজেকে না দেখে এক ঐক্যবদ্ধ জাতি, যাদের পিতৃভূমির একই ঐতিহাসিক ভাগ্য ও সর্বজনীন ভবিষ্যত আছে বলে মনে করে, সম্মিলিত ভাবে উত্সব করবেন.