বুধবারে ইস্তাম্বুলে(তুরস্ক) আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ও আঞ্চলিক রাষ্ট্র গুলি যারা এই দেশের পরিস্থিতির দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে উত্সুক, তাদের এক সম্মেলন হয়েছে. এই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, যেখানে বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন সমস্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করার, যাতে আফগানিস্তানে শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপিত হয় ও সেই দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ভাবেই উন্নতি করতে পারে. এই ধরনের একেবারেই সুস্থ সুন্দর বাক্য বিন্যাসের পিছনে বিশ্বের ও আঞ্চলিক ভাবে নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলির মধ্যে থাকা এক গুচ্ছ পরস্পর বিরোধী ইচ্ছা লুকিয়ে রয়েছে বলে বিশ্বাস করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "আফগানিস্তানে শান্তিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফেরানো, এটা এমন একটা প্রশ্ন, যার অনেক কিছুই অজানা. আফগানিস্তানের সমীকরণের প্রথম ও প্রধান অজানা হল – ২০১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনী প্রত্যাহারের ইচ্ছা কতটা নিশ্চিত. ওসামা বেন লাদেনকে হত্যা করা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের বাহিনীর কোনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এত গুলি বছরে দেখতে পাওয়া যায় নি: তালিবেরা যেমন ২০০১ সালের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ বিলোপ করা সম্ভব হয় নি আর তা বর্তমানে সারা বিশ্ব জুড়েই ছড়িয়ে পড়ছে, বেশী করে পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া জুড়ে. আর মাদক উত্পাদনের হার নিয়ে তো বলার কিছুই নেই: তা শুধু ১৯৯০ সালে তালিবদের চেষ্টায় খুব কমে যাওয়ার জায়গায় আজ তালিবদের আগের সময়ের চেয়েও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে".

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব হারিয়ে ফেলতে রাজী নয়. বিশেষ করে এখন, যখন আরও বেশী করেই মার্কিন, ইজরায়েলের বা গ্রেট ব্রিটেনের তরফ থেকে ইরানের উপরে আঘাত হানার কথা চালাচালি হচ্ছে. আর এর অর্থ হল, আফগানিস্তান থেকে সেনা বাহিনী প্রত্যাহার খুব কমই কিছু পাল্টাবে হয় সেনাদের বদলে বহু সহস্র রক্ষা কর্মী আনা হবে বিভিন্ন কোম্পানী থেকে, অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সেনা বাহিনীর ঘাঁটি গড়ার জন্য নতুন জায়গা – যেমন, পাকিস্তানে অথবা পারস্য উপসাগরের কোন রাজ তন্ত্রে তৈরী করে নেবে. অন্য দিক থেকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুবই চেয়েছে আফগানিস্তানের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রক্সি ওয়ার বা আগে থেকেই কি হবে জেনে যুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করতে চাইছে. আর এই ধরনের কাজের জন্য তারা ভারতকে এগিয়ে দিতে চাইছে. এই কথা উল্লেখ করে ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "ভারতবর্ষ, এক আঞ্চলিক ভাবে বড় রাষ্ট্র, যাদের স্বার্থ কিছুটা আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে মেলে – তারা চায় চিনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার বন্ধ করতে ও চরমপন্থী ঐস্লামিক দলের মোকাবিলা করতে. ইরানের বিষয়ে ভারতের অবস্থান আমেরিকার থেকে আলাদা, তারা আফগানিস্তানের খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল হাজিগাক থেকে ইরানের বন্দর চাবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত রেল পথের নির্মাণে কাজ করতে চেয়েছে, এটাই স্পষ্ট করে প্রমাণ করে দেয় যে, ভারতের ইচ্ছা আমেরিকার থেকে আলাদা ও তারা নিজেদের বর্তমান পরিস্থিতিতে ও অবস্থানে, কিছুতেই চাইবে না আমেরিকার ইচ্ছায় পুতুল হয়ে থাকতে, বরং তার বদলে দিল্লী তেহরানের সঙ্গে আফগানিস্তানের খেলায় নিজেদের খেলাই খেলতে চাইবে".

    বিগত সময়ে বিশেষ করে যখন ভারত আফগানিস্তানের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে, বহু পর্যবেক্ষকই বলা শুরু করেছেন যে, আফগানিস্তান বর্তমানে ভারত পাকিস্তানের বিরোধ ভূমি হয়ে উঠছে. কিন্তু এখানে বলা দরকার যে, পাকিস্তানের এই অঞ্চলে রাজনীতি একেবারেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলা যেতে পারে না. ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কামানের কাজ তারা করেছিল, যাতে ভারতের বিরুদ্ধাচরণ করা যায় ও সোভিয়েত প্রভাবকে আটকে রাখা যায়. আর বিগত বছর গুলিতে তারা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনের রাজনীতির এই অঞ্চলে প্রধান পরিবাহক, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "আজকের দিনে চিনই প্রধান বিদেশী বিনিয়োগকারী দেশ, যারা আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করেছে. আপাততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের মিত্ররা আফগানিস্তানে যুদ্ধের নামে অপ্রকৃতস্থের মতো অর্থ ব্যয় করছে, চিনের কোম্পানীরা এই সময়ে আফগানিস্তানের খনিজ উত্সকে উত্তোলনের কাজ করছে. কিন্তু তাদের সফল কাজের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা. আর এখানে পাকিস্তান চিনের প্রধান মধ্যস্থ হয়েছে আফগানিস্তানের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায়. প্রসঙ্গতঃ শুধু এখনকার প্রশাসনের সঙ্গেই নয়, বরং যারা কারজাইয়ের প্রশাসনের বদলে আসবে তাদের মহাসমুদ্র পারের অভিভাবকদের যাওয়ার পরে."

    আফগানিস্তানের পরিস্থিতির প্রতি নিজেদের স্বার্থের প্রশ্ন তুলেছে, তাদের উত্তর দিকের সহ যোগীরাও – প্রাথমিক ভাবে উজবেকিস্তান, তাজিকিস্থান ও তুর্কমেনিয়া, যারা শুধু সীমানাতেই প্রতিবেশী নয়, প্রজাতিগত ভাবেও তাদের সঙ্গে যুক্ত.

    শেষে রাশিয়াও খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে চায় আফগানিস্তানের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হোক ও সেই দেশ শান্তিপূর্ণ ও উন্নতিশীল হয়ে উঠুক, যারা মাদক দ্রব্যের মূল উত্স হিসাবে আর না থাকুক ও বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী দলের জন্য ঘাঁটি গড়ার জায়গা না হোক.

    এই ভাবেই, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আজ ও আসন্ন ভবিষ্যতে মনে করিয়ে দিচ্ছে এক বিশাল দাবা খেলার বোর্ডকে. শুধু এখানে খেলোয়াড় মাত্র দুই জন নয়, এখানে অনেক বেশী, আর প্রত্যেকেরই নিজস্ব বোড়ে রয়েছে, যা তারা চাইছে মন্ত্রীতে পরিনত হোক, মনে করছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.