গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী পাপানদ্রেউ ফরাসী কান শহরে অর্থনৈতিক ভাবে বিশ্বের বড় কুড়িটি দেশের শীর্ষবৈঠকের প্রাক্কালে এক বিস্ময়কর পদক্ষেপ নিয়ে সকলকে চমকে দিয়েছেন, নিজের দেশে তিনি গণ ভোটের আয়োজন করতে চেয়েছেন এই কারণে, যে বহু কষ্টে সহমতে পৌঁছনো ইউরোপীয় সঙ্ঘের তরফ থেকে প্রস্তাবিত সাহায্যের শর্ত মেনে নেওয়া তাঁর দেশের মানুষদের জন্য ঠিক হবে কি না. যদি সরকার জনগনের কাছে ব্যয় সঙ্কোচের রাজনীতি সমর্থনের প্রস্তাব করে, তবে এই জনতার রায় আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব. জনমতের বিচারে শতকরা ৭০ ভাগ গ্রীক আরও বেশী করে "কষে কোমর বাঁধার" বিরুদ্ধে. তাহলে এর পরে কি হতে চলেছে? এরই উত্তর কান যাওয়ার আগে সন্ত্রস্ত ভাবে খুঁজেছেন মেরকেল, সারকোজি, ইউরোপীয় সঙ্ঘের নেতৃত্ব. এর মধ্যেই এক মুহূর্তে সারা বিশ্বের শেয়ার বাজারে ধ্বস নেমেছে. রাশিয়ার শেয়ার বাজারও নীচে পাক খেয়ে নামছে. আরও বেশী করে দেখা যাচ্ছে যে, রাশিয়ার পক্ষেও নিজেদের "শান্ত বন্দরে" এই ঝড় এড়িয়ে চেপে বসে থাকা চলবে না. "গ্রীক ট্র্যাজেডি" সকলকেই ছুঁয়ে যাবে.

এক সপ্তাহ আগে ইউরোপীয় সঙ্ঘ ব্রিকস সংস্থার দেশ গুলিকে প্রস্তাব করেছিল সমস্যা জীর্ণ দেশ গুলির ঋণপত্র কেনার বাজারে অংশ নিতে. রেডিও রাশিয়াকে এই প্রসঙ্গে রুশ রাষ্ট্রপতির সহকারী আর্কাদি দ্ভরকোভিচ মন্তব্য করে বলেছিলেন:

    "আমাদের অন্যান্য ব্রিকস দেশ গুলির সঙ্গে অবস্থান যোগাযোগ বজায় রেখেই রয়েছে. আমরা তৈরী আছি ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থায় অংশ নিতে, প্রাথমিক ভাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে. আর এটা আমরা এখন করছিও. আমরা তৈরী রয়েছি প্রয়োজনে এই দিকে আরও সক্রিয় ভাবে শক্তি প্রয়োগে. যদি দ্বিপাক্ষিক সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, আমরা সেই সব প্রশ্নেও আলোচনায় রাজী".

    রাশিয়া নিজেদের দিক থেকে সম্ভাব্য সাহায্যের পরিমান বলেছে – এক হাজার কোটি ডলারের সমান অর্থ. চিন আরও বেশী দিতে পারতো. তবে এটা সত্য যে, আপাততঃ তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসা সম্ভব হচ্ছে না. চিনের তরফ থেকে যে সমস্ত উল্টো দিকে শর্ত দেওয়া হয়েছে, ইউরোপের জন্য তা গ্রহণ যোগ্য নয়. সম্ভবতঃ এই বিষয়ে কান শহরে সহমতে আসা সম্ভব হবে. যে ভাবেই হোক, সামনে এক উল্টোরথ: "উন্নতিশীল দেশ গুলি" আলোচনা করছে খাদের কিনারা থেকে ধনী ইউরোপকে টেনে তুলতে. পৃথিবী কি তাহলে উল্টে গিয়েছে? এই প্রশ্নই করা হয়েছে হায়ার স্কুল অফ ইকনমিক্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিভাগের প্রধান ও রাশিয়ার প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ইভগেনি ইয়াসিন কে, তিনি উত্তরে বলেছেন:

"এটা – বিশ্বায়নের ফল, যার থেকে কোথাও পালাবার পথ নেই. যখন কোন একটি না হয়ে, একসাথে অনেক দেশের অর্থনীতির বিপদ উপস্থিত হয়, তখন সহায়তা করার সমস্ত ব্যবস্থা কাজ করা উচিত্. বিশ্বের অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যাদের বিপদ, তাদের সাহায্য করতে যেতে হচ্ছে. প্রশ্ন হল: কি করে সাহায্য করা হবে? আমি মনে করি, সবচেয়ে বাস্তব হল সকলের জন্য এক সম্মিলিত তহবিল গড়ে তোলা, যেটা আন্তর্জাতিক আর্থ- বিনিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পথের এক নতুন পদ্ধতি. বিশ্বের বাজার তার প্রয়োজন বোধ করেছে. আজ এই ব্যবস্থা গ্রীসকে সাহায্য করতে পারে, আর আগামীকাল (কে বলতে পারে?) সেখানে আবেদন জানাতে পারে সেই চিন, রাশিয়া, ফ্রান্স এমনকি জার্মানীও".

সদা চঞ্চলমতি গ্রীসের, যারা সকলকে এক তড়িতাহত অবস্থায় এনেছে, তাদের কি ইউরোপীয় সঙ্ঘ বা ব্রিকসের সাহায্য দরকার হবে? এই প্রসঙ্গে পরামর্শদাতা কোম্পানী নিওকন এর প্রধান মিখাইল হাজিন বলেছেন:

"আসলে ১০ – ২০ – ৩০ হাজার কোটি সেই রকমের অর্থ নয়, যা পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারে. চাই কম করে হলেও ২- ৩ লক্ষ কোটি. কিন্তু সেই ধরনের অর্থ প্রকৃতিতেই নেই. আর যদি তা ছাপাতে হয়, তবে এটা শুধু সমস্ত আর্থ- বিনিয়োগ ব্যবস্থাকেই নষ্ট করে দেবে. এখানে প্রধান বিষয় মনে রাখা দরকার হবে, বর্তমানের অর্থনীতির মডেল, যখন ঋণ শোধ করা হয় না, শুধু তা নতুন করে অর্থ দিয়ে চাঙ্গা রাখা হয়, তা এখন নিজে থেকেই অচল হয়ে গিয়েছে. প্রয়োজন পড়েছে সম্পূর্ণ অন্য রকমের পরিবর্তনের! সেই গুলি নিয়ে ভাবা উচিত্, তা প্রস্তাব করা উচিত্. গ্রীসের ভেঙে পড়া বিশাল গহ্বর চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে লাভ হবে না. আর এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় – গণ ভোট হবে, কিংবা হবে না, সেখানে কি সিদ্ধান্ত হবে. যাই হোক গ্রীসের দেউলিয়া হওয়া অনিবার্য, যেমন এটাও অনিবার্য যে ইউরো এলাকা শেষমেষ টুকরো হয়ে যাবেই. আমি মনে করি, অনেকেই এটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু... নেতৃস্থানীয় দেশ গুলিতে – জার্মানীতে ও ফ্রান্সে ভোট হওয়া পর্যন্ত সময় টানতে চাইছেন. রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল – নির্বাচন! সুতরাং আমি এই শীর্ষ বৈঠক থেকে কোন খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আশা করছি না".

আর শেষ আঁচড়: জার্মানীর সংবাদপত্র স্পীগেল এই উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের শেষে নেওয়া প্রস্তাবের কিছু খবর এখনই পেয়েছে. তা বিচার করে মনে হয়েছে, বিশ্বের বিনিয়োগ বাজারের জন্য এক গুচ্ছ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তাব তৈরী হচ্ছে. এটা ঠিক তাই কি না, খুব শীঘ্রই জানতে পারবো.