১৯২৯ সালে তত্কালিন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিদেশি ভাষায় রেডিও সম্প্রচারের জন্য বহির্বিশ্বে রেডিও সম্প্র্চার ও কনসার্ট আয়োজন শীর্ষক কার্যক্রম গ্রহন করে। শুধুমাত্র বিদেশি ভাষায় রেডিও সম্প্রচারের জন্যই আলাদা বিভাগ তৈরী করা হয়। শুরু থেকে এই রেডিও কেন্দ্রের নামও অনেকবার পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন সময় এর নাম ছিল ‘মস্কো রেডিও’, ‘বিদেশি সম্প্রচার’ এবং সর্বশেষ ‘দ্যা ভয়েস অব রাশিয়া’ । বিশ্বের অন্যতম একটি রেডিও স্টেশনের আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে।

৮২ বছরের ইতিহাস যা শুরু হয়েছিল সাদামাটা ভাবেই তবে ধারন করার মত এক বানীর মাধ্যমে এবং তা হচ্ছে ‘মস্কো বলছে’ । ওই সময় ‘বিদেশি সম্প্রচার’ কেন্দ্র থেকে জার্মান ভাষায় সম্প্রচার শুরু হয়। এর কিছুটা পরে ইংরেজী ও ফরাসী ভাষা যুক্ত হয়। উল্লেখ্য,এর ৩ বছর পর বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে ইংরেজী ভাষা চালু হয়। আর ভয়েস অব আমেরিকায় তা চালু হয় ৭ বছর পর।

মস্কো থেকে সম্প্রচারিত বিভিন্ন ভাষার অনুষ্ঠান অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিভিন্ন সংকটের সময়ও ভয়েস অব রাশিয়া তার প্রচার সম্প্রচার বন্ধ রাখে নি। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় বেতার সম্প্রচার যা ভয়েস অব রাশিয়ার ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে আছে। এমনটি বলছিলেন ভয়েস অব রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ইন্না জাসকো।

‘জার্মানরা ১৯৩৬ সাল থেকে মস্কো রেডিও শুনতে পায়। তবে ১৯৩৯ সালে জার্মানির সব রেডিও সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে সতর্কবানী দেওয়া হয়। যারা মস্কো রেডিও শুনবে তাদেরকে জেল হাজতে বন্দী করা হবে। ১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে জার্মানি সৈন্যরা প্রথমবারের মত মস্কো রেডিও সম্প্রচার ভবনে বোমা হামলা করে এবং সব কর্মীরা মাটির নীচ তলার কক্ষে জড়ো হয়। যদিও ওই স্থানে কাজ করার মত পরিবেশ না থাকায় ইতালিয়ান বিভাগ নিজেদের স্থানেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রেডিওর কর্মীরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখেন যে,রেডিও অফিসের ওই বাড়ির সামনেই জার্মান সৈন্যরা বোমা হামলা চালাচ্ছে। ওই দিনই পুশকিন স্কোয়ারে যেখানে রেডিও ভবন অবস্থিত সেখানে ৩টি বোমা ফেলে রাখা হয়,তবে এর একটিও বিস্ফোরিত হয় নি। তবে লোকজনের মুখে শোনা যায় যে,ওই ৩টি বোমার ১টিতে লেখা ছিল, ‘যেভাবে পারব, সাহায্য করব’ ।

বলা যেতে পারে যে,মস্কো রেডিও পৃথিবীকে পারমানবিক যুদ্ধ থেকে উদ্ধার করেছে। ১৯৬২ সালে ক্যারিবীয় সংকটের সময় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল তখন রেডিও মস্কো নিয়মিত সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে মস্কোর সিদ্ধান্তের কথা ওয়াশিংটনকে জানায়। জানালেন ভালেনতিন জোরিন যিনি পরোক্ষভাবে ওই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘আমি ওয়াশিংটন থেকে এই ঘটনা পর্যবেক্ষন করেছি। সত্যিই ওই সময়টা ছিল খুবই দুঃসহ। পৃথিবী ছিল একদম পারমানবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। আমি ঠিক বলতে পারব না যে, পুরো আমেরিকাই মস্কো রেডিও তখন শুনত কিন্তু ওই সময়ের সব গনমাধ্যমে মস্কোর প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। মস্কো রেডিওর সংবাদ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এ সংক্রান্ত বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়। ওই মূহুর্তে একমাত্র না হলেও অন্যতম একটি গনমাধ্যম হিসেবে মস্কো রেডিও পৃথিবীকে বিপজ্জনক অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছে’।

দ্যা ভয়েস অব রাশিয়া বর্তমানে ৩৮ ভাষায় তাদের বেতার সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন বিশ্বের ১৬০টি দেশের জন্য এই বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ভয়েস অব রাশিয়ার অনুষ্ঠান প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। শ্রোতাদের কাছে রাশিয়ার সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে বেতার কেন্দ্রটি সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যেমন, ইন্টারনেটের কল্যানে বর্তমানে শ্রোতারা শুধুমাত্র রেডিও অনুষ্ঠান শোনা ছাড়াও টেলিভিশনের মতই ভিডিও চিত্র দেখা,সংবাদ পড়া,সামাজিক নেটওয়ার্ক সাইটে সংবাদ প্রচার ও এমনকি আরএসএস ফিডের মাধ্যমে রেডিওর অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানতে পারছেন। শ্রোতাদের সাথে ব্যাপক অর্থে রেডিওর এখন যোগাযোগ রয়েছে।দ্যা ভয়েস অব রাশিয়ার ঠিকানায় নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে চিঠি আসে। যুক্তরাজ্যে আমাদের নিয়মিত শ্রোতা জর্জ স্কিন্নিয়েরা প্রায়ই চিঠিতে লিখে থাকেন, ‘আপনারা আছেন সেইজন্য আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। আমি বিভিন্ন কারণে আপনাদের অনুষ্ঠান শুনে থাকি। এর ১টি কারণ হচ্ছে, সংবাদ প্রচারের ধরন। রাশিয়া বিষয়ক সংবাদ শুনতে পারা আমার জন্য সবসময়ই আনন্দের। আমি আশা করছি আমার সবচেয়ে পছন্দের আন্তর্জাতিক এই বেতার কেন্দ্র ‘দ্যা ভয়েস অব রাশিয়া’র অনুষ্ঠান আরও অনেক বছর শুনতে পারব।    

১৯৪২ সালের ১৮ মে ভারতীয় উপমহাদেশে ভয়েস অব রাশিয়ার অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। ওই দিনগুলো ২য় বিশ্ব যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য চালু হওয়া প্রথম অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘রনক্ষেত্রের সংবাদ’ । তবে,১৯৫৫ সাল থেকে আলাদাভাবে হিন্দী,উর্দু এবং বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার চালু হয়।