রাষ্ট্রসঙ্ঘের  বিশেষজ্ঞদের মতে ৩১শে অক্টোবর বিশ্বে সাতশো কোটিতম বসবাসকারী জন্ম নেবে. যখন বিশ্বের জনসংখ্যা আরও একটি সীমা অতিক্রম করে, তখন এই ঘটনা সব সময়েই সেই বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি কি ধরনের ভাল ও মন্দ বিষয়,সাথে করে নিয়ে আসে তার গতির সঙ্গে.

ঠিক কোথায় সাতশো কোটি তম বিশ্বের বাসিন্দা জন্ম নেবে, তা অবশ্যই কেউই কখনও বলতে পারবে না. সম্ভাবনার তত্ত্ব অনুযায়ী এটা হতে পারে বিশ্বের কোন একটি সর্বাপেক্ষা জনবহুল দেশেই. প্রসঙ্গতঃ এই বিষয়ে ভারতের সম্ভাবনা চিনের চেয়ে বেশী, কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিতে ভারতবর্ষ বর্তমানে চিনের চেয়ে এগিয়ে. কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘ স্থির করেছে যে, “জয়ন্তী চিহ্ণিত” শিশুটি জন্ম নেবে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদে. এই শহর বাছা হয়েছে কারণ এখানেই আন্তর্জাতিক এই সংস্থার বিশ্ব জনসংখ্যা সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে বলে. গত দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞদের পছন্দ হয়েছিল বালকানের দেশ গুলি – ১৯৮৭ সালে পাঁচশো কোটিতম বিশ্বের মানুষের জন্মের সময়ে ক্রোয়েশিয়া ও ১৯৯৯ সালে ছয়শো কোটিতম মানুষের জন্ম উপলক্ষে বসনিয়া.

প্রসঙ্গততঃ এই সবই শর্ত সাপেক্ষ ব্যাপার. কিন্তু আসলে বিশেষজ্ঞদের বেশী করে উদ্বিগ্ন করেছে অন্য প্রসঙ্গ – আর প্রাথমিক ভাবে তা হল: এই রকমের থামানো যাচ্ছে না এমন জনসংখ্যা বৃদ্ধি কি পৃথিবীতে দারিদ্র বাড়াবে না, আর মাত্র তিন বা চার দশক পরেই কি সারা বিশ্ব জুড়ে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যাবে না, যখন জনসংখ্যা আরও দুশো – তিনশো কোটি বেড়ে যাবে বলে?

রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি মনে করেন এই নিয়ে ভয় পাওয়ার  মতো কিছু নেই, - শুধু চিন্তা করতে হবে সেই সমস্ত সম্পদের যথার্থ ব্যবহার কি করে করা সম্ভব হয়, যা আজ মানব সমাজের কাছে রয়েছে, তাই বলেছেন:

“বিগত কিছু সময় ধরে এই সমস্যা নিয়ে কথা বলার সময়ে ইংরেজ ধর্মগুরু, অর্থনীতিবিদ ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ টমাস ম্যালথাসের কথা মনে করা হয়, যিনি সেই আঠেরোশো শতকের শেষেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, বিশ্বে জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে, আর এর একমাত্র ঠেকিয়ে রাখার ব্যবস্থা হিসাবে তিনি শুধু যুদ্ধকেই ভেবেছিলেন, যা দিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব.

আর পরবর্তী কালেও নানা প্রবন্ধ এই বিষয়ে রচিত হয়েছে, যেখানে কোন না কোন ভাবে ম্যালথাসের বক্তব্যকে ভিত্তি করা হয়েছে ও মানব সমাজের আসন্ন ধ্বংস হওয়ার কথাই বলা হয়েছে. যেমন, ১৯৬৮ সালে আমেরিকার জীববিজ্ঞানী, পরিবেশ বিদ্ ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ পল আর. এলরিখ “জনপ্রজাতির বোমা” নামে একটি বই লিখেছিলেন, যেখানে সোজাসুজি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: “সত্তরের দশকে বহু লক্ষ মানুষ মারা যাবে দুর্ভিক্ষে... কিছুই মৃত্যুর হারের দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে ঠেকাতে পারবে না... আমি ভারতবর্ষের পক্ষে ১৯৮০ সালে আরও কুড়ি কোটি লোককে খেতে দেওয়ার মতো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না”. কিন্তু এই ধরনের কিছুই হয় নি”.

ভারতের জনসংখ্যা কুড়ি কোটির চেয়ে অনেক বেশীই বেড়ে গিয়েছে, আর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সালে ভারত চিনকে জনসংখ্যায় অতিক্রম করবে. আর যদিও ভারতে গরীব মানুষের সংখ্যা আগের মতই অনেক, তাও দারিদ্র সীমার নীচে থাকা লোকেদের সংখ্যা ক্রমাগতভাবেই কমে আসছে. যদি ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল শতকরা ৫১ ভাগ, তবে ২০১৫ সালে পূর্বানুমান অনুযায়ী তা হবে শতকরা ২২ শতাংশ, এই বিষয়ে উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রবার্ট আলিবের যে রকম উল্লেখ করেছেন, “ম্যালথাস সঠিক ছিলেন না বিগত দুশো বছর ধরেই, তাই কেনই বা তিনি আগামী একশো বছরে ঠিক বলে প্রমাণিত হতে যাবেন?” আর ভারতের এক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বিবেক দেবরয় লিখছেন: “যদি আমাদের দেশের জমির উর্বরতা দেখা হয়, তবে ভারত স্বাভাবিক ভাবেই দুশো কোটি লোকের অন্ন সংস্থান করতে পারে”. এখানে সমস্যা, তাঁর মতে, শুধুমাত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নয়, বাজে পরিকল্পনা ও নিষ্ফল নিয়ন্ত্রণে.

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়াতে আবহাওয়ার পরিবর্তনও হচ্ছে. হিমবাহ গুলির সক্রিয় ভাবে গলে যাওয়া বিশ্বের নানা জায়গায় ধ্বংসাত্মক বণ্যার সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে বিগত কিছু বছরে ভারত ও পাকিস্থানও রয়েছে, আর বিশ্বের মহাসমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল গুলির ও কিছু দ্বীপ এলাকার দেশের সম্পূর্ণ ভাবেই জলের তলায় ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে”.

রুশ বিশেষজ্ঞের মতে - সুতরাং এই সমস্ত সমস্যা একই সঙ্গে দেখা উচিত্. আর কোন একটি মাত্র ব্যবস্থা এই ক্ষেত্রে হতে পারে না. অন্ততঃ – চিনের পথে, অর্থাত্ প্রতি পরিবারে একটি মাত্র শিশু জন্মাতে পারে, এই ধরনের জোর করে জন্মের হার কমানোর ব্যবস্থার পথে চলার মানে হয় না. ভারতে এই ধরনের রাজনীতি ১৯৭০এর দশকেই জরুরী অবস্থা জারী করার সময়ে বাড়তি চাপ হিসাবে করাতে, তার সম্বন্ধে জনতার কাছ থেকে খালি নিন্দাই কুড়িয়েছে.