রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে লিবিয়ার ওপর নো-ফ্লাই জোন বাতিলের জন্য একটি রেজ্যুলেশনের প্রস্তাব দিয়েছে।যেহুতু নিরাপত্তা পরিষদই লিবিয়ায় নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করেছিল তাই এই সংস্থাকেই তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভিতালি চুরকিন এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছেন।তার ভাষায়,একই সাথে ১৯৭৩ সালের রেজ্যুলেশন অবশ্যই বন্ধ করা উচিত।

লিবিয়ায় পশ্চিমা মিত্রবাহিনীর সামরিক অভিযান যা শতশত নিরীহ লিবিয় জনগনের জীবণ কেড়ে  নিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীন এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রস্তাব মেনে নিলে হয়ত এই হানাহানির ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া যেত। যারা লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবেলায় একটি মধ্যস্থকারীর ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা মিত্রজোট যে কোন উপায় গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিল। কি ঘটল অবশেষে?। লিবিয় নেতাকে বিদ্রোহীরা আটক করল এবং গুলি করে হত্যা করল। পরিশেষে পশ্চিমা মিত্রজোট শান্তির নিঃশ্বাষ ফেলেছে।

গাদ্দাফির মৃত্যুর বিষয়টি বিশ্বে বিভিন্নভাবে আলোচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সেক্রেটারীর কাছে গাদ্দাফির নিহতের ঘটনাকে তদন্ত করার আহবান জানানো হয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ একই বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি রাশিয়ার তিনটি  রেডিও স্টেশন ‘ভয়েস অব রাশিয়া’, ‘রেডিও রাশিয়া’ ও ‘ইকো মস্কো’র শ্রোতাদের সরাসরি প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ি গাদ্দাফিকে যখন বিদ্রোহীরা আটক করে তখনই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহন করা উচিত ছিল।অন্তত তাকে না মেরে ওই সময় প্রয়োজনীয় সাহায্য দেয়াটাই মূল কাজ ছিল’।মন্ত্রীর কথা অনুযায়ি,গাদ্দাফি নিজেই ছিলেন বিদ্রোহী এবং ওই বিদ্রোহীরাই তাকে হত্যা করেছে যা সরাসরি জেনেভা ঘোষনায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ল্যাভরোভ একই সাথে লিবিয়ায় ন্যাটোর পরিচালিত  সামরিক অভিযানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন।

ন্যাটো মুহাম্মর গাদ্দাফির নিহতের ঘটনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যদিও সবার কাছেই বিষয়টি পরিষ্কার যে,মুহাম্মর গাদ্দাফির জীবনের শেষ কয়েক দিনে তার টেলিফোন আলাপচারিতা ন্যাটোর গোয়েন্দা দল আড়িপেতে শোনে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে। জীবিত গাদ্দাফি পশ্চিমা জোটের জন্য অনেকটা বিপদের কারণ ছিল। যদি গাদ্দাফিকে আদালতের শরনাপন্ন করা হত তাহলে তিনি অনেক কিছুই হয়ত বর্ননা করতেন। এমনটি মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্য কূটনৈতিক একাডেমির মহাপরিচালক আন্দ্রেই ভালোদিন.তিনি বলছেন, ‘বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়,যখন তাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় এর পূর্বে তাকে উদ্দারের সময় গাদ্দাফিকে নিস্তেজ মনে হয়েছে। অন্যদিকে ওই বিদ্রোহীদের অধিকাংশই ন্যাটো কর্তৃক পরিচালিত। ৩টি দেশই খুব চাচ্ছিল যেন গাদ্দাফিকে আদালতে সমর্পন না করা হয়। দেশ ৩টি হল-ফ্রান্স,যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র’।

এখান থেকেই যে পরিষ্কার ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে তা হল,গাদ্দাফিকে হত্যা করাই ছিল ন্যাটের সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য। এদিকে রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমার আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির প্রধান কন্সানতিন কাসাচেভ নিজের ব্লগে লিখেছেন, ‘ভবিষ্যত লিবিয়ার বা অন্যান্য আরব দেশের(আরব বসন্ত বলে আখ্যায়িত) জন্য প্রধান প্রশ্ন হচ্ছেঃএ যুদ্ধে কেউই জয়ী হয় নি বরং বিশ্বে কে জয়ী হল’ ।  কন্সানতিন কাসাচেভের সাথে একমতই প্রকাশ করেছেন আমাদের বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই ভালোদিন। তিনি বলছেন, ‘লিবিয়ার জন্য সবকিছুই কেবল শুরু হল। লিবিয়ার সমাজে আছে বিদ্রোহী এবং একই সাথে রয়েছে গোষ্ঠীগত মনোভাব। যে কোন সংকট মুহূর্তে গাদ্দাফি তার শাষনামলে অন্তত রাষ্ট্রকে একটি ধারায় রেখেছিলেন এবং ভৌগলিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। লিবিয়ার  বিদ্রোহীদের মধ্যেও বর্তমানে  উজ্জ্বল কোন নেতা নেই এবং তাদের নিজেদের মাঝেই রয়েছে আবার অভ্যন্তরীণ কোন্দোল।

মস্কো আশা করছে যে,লিবিয়ায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসবে এবং গনতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যাবে। মস্কো মনে করে, রাষ্ট্রের যে কোন অভ্যন্তরীণ সংকটে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ করা  হবে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশনকে অবমাননার শামিল।