লিবিয়ার নয়া নেতৃবৃন্দের মুয়াম্মার গদ্দাফির মৃত্যুর প্রকৃত কারন সম্পর্কে সরকারি ভাষ্য হল –মাথায় চোট পেয়ে মারা গেছেন. যাতে মৃত্যু সম্পর্কে কোনো সন্দেহ না থাকে, সেই জন্য বিদেশী সাংবাদিকদের মৃতদেহ দেখানো হয়েছে.

   কিন্তু হত্যাকান্ড যে পূর্বপরিকল্পিত নয়, সে বিষয়ে বহু বিশেষজ্ঞের সংশয় আছে. মানবাধিকার রক্ষাকারী ‘আন্তর্জাতিক রাজমুক্তি’ নামক সংস্থা গদ্দাফির মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী জানিয়েছে. এবং যতদূর বোঝা যাচ্ছে, মৃত্যুর কারন সম্পর্কে সরকারি ভাষ্য সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার কারন আছে.

     আল আরাবিয়া দূরদর্শন চ্যানেল দেখিয়েছে, যে একজন লিবিয় যুবক জাতীয় পরিষদের উল্লসিত সদস্যদের কাঁধে চড়ে যাচ্ছে. তার হাতে ছিল সোনার পিস্তল, যেটা ঐ যুবক নাকি কর্ণেলকে হত্যা করার আগে তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়. বোঝা যাচ্ছে, যে মৃত্যুর আগে গদ্দাফিকে নিয়ে ক্রূর উপহাস করা হয়েছে, তাকে জীবিত অবস্থাতেই ধরা হয়েছিল. উন্মত্ত বিদ্রোহীরা প্রথমে গদ্দাফিকে প্রহার করে, আর তারপরে কেউ একজন তার মাথা,দুই পা ও পেট লক্ষ্য করে বেশ কয়েকবার গুলি চালায়.  কপালে শেষ গুলিটা ঐ ১৮ বছর বয়স্ক যুবকই চালিয়েছিল. গদ্দাফির জল্লাদেরা যেন হিলারি ক্লিনটনের শাস্তিদানের সুপারিশ পালন করলো. এর ঠিক আগেই লিবিয়া সফরকালে তিনি বলেছিলেন, যে গদ্দাফিকে হয় আটক করা নয়তো হত্যা করা দরকার. তার আবদার পূরণ করা হল.

     আজ লিবিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গোটা দেশকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে. ত্রিপোলির নতুন মালিকরা ও তাদের মদত দেওয়া পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক নেতারা ‘গদ্দাফি সমস্যা’ থেকে মুক্তি পাওয়া উপলক্ষ্যে পরস্পরকে অভিনন্দন জানাচ্ছে. অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি হুগো চাভেসের উক্তি এই প্রসঙ্গে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ. তার দৃঢ় বিশ্বাস, যে ইতিহাসে গদ্দাফি স্থান পাবেন শহীদ হিসাবে. মুয়াম্মার গদ্দাফিকে রোম্যান্টিক বিপ্লবী, লিবিয়ার গ্যারিবল্ডি, আফ্রিকার চে গুয়েভারা বলে অভিহিত করা হচ্ছে. তিনি পাশ্চাত্যের সাথে সংগ্রামের প্রতীক হতে পারেন, কারন তার দেশে বিদেশী অনুপ্রবেশের সময় তার মৃত্যু হয়েছে. আরবী গবেষণা কেন্দ্রের প্রাচ্যতত্ববিদ ভ্লাদিমির সোতনিকভ সেই রকম মত পোষন করেন.

     গদ্দাফি যতই হোক না কেন লিবিয়ার প্রতীক ছিলেন. লিবিয়ার জনগণ তার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বা গণ অভ্যুত্থাণ সংগঠন করলেও, তিনি শহীদ হিসাবে গণ্য হবেন. আমরা সবাই জানি, যে ফ্রান্স, বৃটেন এবং আমেরিকার বিভিন্ন সশস্ত্র বিভাগ বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছে. যারা গদ্দাফির নাম উড্ডীয়মান পতাকার মতো তুলে ধরতে চায়, তারা এটাকে ব্যবহার করবে.

      লিবিয়ার ভাগ্য সম্পর্কে মস্কো কি ভাবছে ? মুয়াম্মার গদ্দাফির মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরে অনতিবিলম্বে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দমিত্রি মেদভেদেভ ঘোষণা করেছেন -

      আমরা আশা করবো, যে লিবিয়ায় শান্তি পুণর্স্থাপিত হবে. এখন যারা দেশ চালাচ্ছে, সেই বিভিন্ন উপজাতির প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা সম্মন্ধে চূড়ান্ত সম্মতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, আর লিবিয়া একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে. তা নাহলে সাম্প্রতিক কালে যে সব ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল, সে সবকিছু বিফলে যাবে.

    উপজাতিদের মধ্যে যুদ্ধের আশংকা এতটাই গুরুতর, যে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় পরিষদের প্রধান মাহমুদ জিব্রিল পদত্যাগ করার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছেন. দেশের পরিস্থিতি একেবারেই আন্দাজ করা যাচ্ছে না. গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত লিবিয়ার বাসিন্দারা মোটামুটি সমৃদ্ধশীল জীবিকা নির্বাহ করেছে. কিন্তু পরিস্কার রাস্তাঘাট, যত্ন করে সাজানো শহর, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এখন ইতিহাসে পর্যবসিত হয়েছে.