রাশিয়ার “নেজাভিসিমায়া গাজেতা”  “ভারতে পরমাণু ভীতি” নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে. এখন শুনুন তার সারমর্ম :

   ফুকুসিমা দুর্ঘটনা পরবর্তী সামান্য বিরতির পরে এবং পারমাণবিক প্রকৌশলের অধিকারী এবং পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তি উত্পাদনকারী দেশগুলি পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তি বিকাশের ধারা ক্রমানুবর্তনের কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে. আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি এজেন্সির পূর্বাভাষ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে পৃথিবীতে ৩৫০টি নতুন রিয়াক্টর দেখা দেবে. ভারত আগামী ৩০ বছরে ৩০টি পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র তৈরি করবে, আর ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে উত্পাদিত বিদ্যুত্শক্তির এক চতুর্থাংশ উত্পাদিত হবে পারমাণবিক জ্বালানীর সাহায্যে. এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই গত বছরে ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ- লোকসভা আইন গ্রহণ করেছে, যা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য ভারতের পারমাণবিক শক্তির বাজার উন্মুক্ত করেছে. এ সিদ্ধান্ত পারমাণবিক প্রকৌশল উত্পাদনকারী বহু দেশের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে. কারণ, বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পরামাণবিক শক্তির বাজারের মূল্যায়ন করা হচ্ছে ১৫ হাজার কোটি ডলার.

   কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশের পরিকল্পনায় হস্তক্ষেপ করছে রাজনীতি, আর তা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ সম্পর্কে সন্দেহ জাগাচ্ছে. এখন ভারতের তামিলনাডু রাজ্যে দুটি পুরোপুরিভাবে তৈরি ৩+ প্রজন্মের আধুনিক বিদ্যুত্ ব্লক চালু করা স্থগিত রাখার দাবিতে অনশন ধর্ণঘট চলছে. প্রত্যেকটি বিদ্যুত্ ব্লকের ক্ষমতা ১০০০ মেগাওয়াট. কুদানকুলাম বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রথম ব্লক চালু করার কথা ছিল এ বছরেই. আর আগামী বছরের প্রথমার্ধে দ্বিতীয় ব্লক চালু করার পরিকল্পনা ছিল. কথা হচ্ছে তামিলনাডুতে “রসআতোম” সংস্থার দ্বারা “কুদানকুলাম” পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ সম্পর্কে. এর নির্মাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয়েছে. মোট বিনিয়োগ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার উপরে ছিল. এ পারমাণবিক কেন্দ্রটি ভারতের গোটা ইতিহাসে বাস্তবাযিত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প.

   পারমাণবিক বিদ্যুত্কেন্দ্রের বিরোধীরা যে মুখ্য ধারণার উপর বাজি রাখছে, তা পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তির বিপদের সাথে জড়িত, যা দেখিয়েছে জাপানের ফুকুসিমার দুর্ঘটনা. তবে সেই সঙ্গে, স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখ করতে ভুলে যাচ্ছে যে, “ফুকুসিমা-১” কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল গত শতকের পঞ্চাশের দশকে মার্কিনী প্রকৌশলে এবং অবশ্যই আজ তা প্রথম প্রজন্মের সেকেলে কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়. লোকেদের কেউ ব্যাখ্যা করছে না যে, জাপানীরা এমনকি পুরনো সরঞ্জামের সময় মতো আধুনিকীকরণেরও চেষ্টা করে নি কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগে. কিন্তু এর জন্য অন্যান্য দেশে আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের কর্মসূচি সন্দেহজনক করে তোলা হচ্ছে কেন? খাস ভারতেই, যেমন মাদ্রাজে সফলভাবে কাজ করছে আগের প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, যার এখন স্ট্রেস-টেস্ট করা হচ্ছে ফুকুসিমা পরবর্তী নিরাপত্তার সব দাবি বিবেচনা করে. আর জনসাধারণ রাস্তায় মিছিলে বের হচ্ছে না চালু কেন্দ্র বন্ধ করার দাবিতে, কারণ লোকে উপলব্ধি করেছে যে, পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র – এ শুধু বিদ্যত্শক্তিই নয়, এ হল স্থানীয় বাজেটে বিপুল পরিমাণ কর জমা পড়ার উত্স, নতুন নতুন শিল্প প্রকল্প, যার অর্থ অর্থনৈতিক বিকাশের উচ্চ গতি এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মস্থলের সৃষ্টি.

   “ফুকুসিমা-১” পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রে দুর্ঘটনার আগে পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তি প্রতি আগ্রহের বৃদ্ধিতে যেসব উপাদান প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা আজও বিদ্যমান আছে, সেই সঙ্গে বিদ্যুতশক্তির বিশ্বব্যাপী চাহিদা বৃদ্ধি, এবং বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিপদে প্রতিবেশের জন্য দুশ্চিন্তা. এ সম্বন্ধে রাশিয়ার বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির গ্রাচেভ বলেন, “১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, যে ক্ষমতা কুদানকুলামের প্রথম ব্লকের, তা বছরে বায়ুমন্ডলে ছাড়ে ১ লক্ষ ৪০ হাজার টন সালফার অ্যানহাইড্রাইট, যা ২ লক্ষ ৮০ হাজার টন সালফিউরিক অ্যাসিড দিতে পারে. আর অ্যাসিড-বৃষ্টি জীবন্ত সবকিছু ধ্বংস করে. এক বছরে তাপ-বিদ্যুত কেন্দ্র সমান ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের চেয়ে বেশি তেজষ্ক্রিয়তা বিকিরণ করে. তাছাড়া, জৈবিক জ্বালানী পোড়ানোর ফলে বায়ুমন্ডলে নির্গত হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড, ফলে  বায়ুমন্ডলে তাপের সঞ্চয় হতে থাকে. তার ফলে তাপমাত্রা বাড়ে. নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ৪৯ জন বিজ্ঞানীর মতে, পৃথিবীতে গ্রীনহাউজ এফেক্ট বৃদ্ধির কুপরিণতিকে তুলনা করা যেতে পারে শুধু বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক যুদ্ধের সাথে. বন্যা, ঝড় এবং অন্যান্য দুর্যোগ – সব এরই ফল”.

   কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র শুধু ভারতেই নয় সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে ফলপ্রসূ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সারিতে পড়ে. কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রকল্প রুশ ফেডারেশন তথা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি এজেন্সির ২০০০ সালের পরে নির্মিত সমস্ত কেন্দ্রের প্রতি  প্রযুক্তিগত দাবির সাথে সুসঙ্গত. পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তির সমস্যা বিষয়ে  রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ পার্ফিরিয়েভ উল্লেখ করেন :

   বিগত কয়েক বছরে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, বিদ্যমান সমস্ত ঝুঁকি সত্ত্বেও পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র  যথেষ্ট নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে এবং গ্রীনহাউজ এফেক্টের মতো প্রতিবেশের দুষণ কমায়.

    তবে, তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, কি হবে, যদি পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করা না হয়?লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে প্রকল্পের কনসার্ভেশন, ডিমন্টেজের জন্য, ভবিষ্যতে তা সংরক্ষণের জন্য. শিল্পায়নের গতির তীব্র হ্রাস হবে. আর প্রদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ মন্থর হয়ে পড়বে. আর তার অর্থ বেকারী, সামাজিক প্রয়োজনে অর্থের অভাব, সাধারণ ভারতীয়দের জীবনের এমনিতেই অনুচ্চ মানের আরও অবনতি. লাভ হবে শুধু ভারতীয় রাডিক্যালদের এবং তাদের, যাদের জন্য একোলজি হল ব্যবসা.

   বিশেষজ্ঞরা এ ইতিহাসে মার্কিনী চিহ্ণও বাদ দিচ্ছেন না, লিখেছে সবশেষে পত্রিকাটি. ভারতীয় পার্লামেন্টের দ্বারা পারমাণবিক ক্ষতির জন্য সরঞ্জাম সরবরাহকারীর দায়িত্ব সংক্রান্ত আইন গ্রহণের পরে মার্কিনী কোম্পানিগুলি ভারতের বড় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে. অতএব, তাদের খোঁজা দরকার, যাদের জন্য এটা লাভজনক.