‘ওয়ালস্ট্রীট দখল করো’ আন্দোলনের একমাস পূর্তি হল. এই সময়ের মধ্যে আমেরিকার স্থানীয় আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে. সারা বিশ্ব জুড়ে বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক চলছে – এই প্রতিবাদের পরিণতি কি হবে. ইতালিতে, যেখানে মিছিলকারীরা রাস্তায় ভাঙচুর করেছে, এই ঘটনা প্রমাণ করে, যে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন শাসক কতৃপক্ষের বিরূদ্ধে পূর্ণমাত্রার আন্দোলনে পরিণত হতে পারে. আর আমেরিকায় সম্প্রতি গৃহীত জনমতামতের ফলাফল হল এই, যে নতুন আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই বদলে দিতে পারে.

       অর্থনৈতিক সংকট, যেখানে সারা পৃথিবী নতুন করে ডুবছে, অথবা ২০০৮ সাল থেকে আরোগ্যলাভ করতে পারছে না, মনে হচ্ছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হচ্ছে. বিশেষজ্ঞেরা উল্লেখ করছেন,  গত তিন বছর ধরে যে আর্থিক চাপান-উতোর চলছে, তা পুঁজিবাদের দ্বন্দকে উলঙ্গ করে দিয়েছে. বড় বড় কর্পোরেশনের ওপর ভরসা করে, তাদের পেছনে অগাধ অর্থ ব্যয় করা, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পকে অগ্রাহ্য করা এবং সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় কমানো – এই সবকিছুই গণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তারপরে প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে. বিশেষতঃ সেই সব দেশে, যারা মার্কিনী অর্থনৈতিক মডেলের অনুকরন করে. শ্লোগান একটাই – লাগামছাড়া ঘনকুবেরদের, যারা ফাটকা বাজিতে মেতে আছে, সরকার তাদের সাধারন জনগণের খাজনার পয়সায় পুষছে, তাদের জব্দ করতে হবে. এইখান থেকেই সমাজে সমস্যার উদ্রেক হচ্ছে. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের মতে, রাশিয়া এই সমস্যা এড়িয়ে যেতে পেরেছে, আর তাই এখানে কোনো গণআন্দোলন হয়নি.

      আমাদের খুব ভালো করে আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়া, যা দেশের অভ্যন্তরে চলছে, সেটা বুঝতে হবে. রাশিয়ার নাগরিকেরা স্বাস্থ্যের খাতে, সন্তানদের শিক্ষার খাতে, পারিবারিক বাজেটের দিক থেকে বুঝতে পারছে, যে দেশে সমৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান. শুধু সেক্ষেত্রেই দেশবাসীর সমর্থন পাওয়া সম্ভব এবং তাদের আস্থাভাজন হওয়া সম্ভব. যদি তা নাহয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে, যা আমরা বহু উন্নত পুঁজিপতি দেশে অবলোকন করছি, যেখানে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরোচ্ছে.

       এখানে উল্লেখ করা উচিত, যে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে, যেখানে অংশতঃ সমাজতান্ত্রিক অতীতের কিছু কিছু সামাজিক মূলনীতি এখনো বহাল আছে, সেখানে কিন্তু এরকম কোনো আন্দোলন হচ্ছে না. স্ক্যানডিনেভিয়ার দেশগুলিও শান্ত, যেখানে নাগরিকদের স্বার্থরক্ষা হল বৃহত্তম কর্তব্য. ঐ সব দেশে পেন্সনের হার খুব উঁচু, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খাতে সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করে. ঐ সব দেশে নাগরিকেরা অনেক বেশি সুরক্ষিত, আর তাই তারা আন্দোলনে নামেনি.

     কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে এই আন্দোলনের পরিণতি সুদূরপ্রসারী হতে পারে. বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেযে বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে পড়েছে ইতালি ও গ্রীস, যেখানে সরকার সামাজিক খাতে ব্যয়ের কাটছাঁট করেছে. বৃটেনও ঝুঁকির এলাকা, যেখানে ইদানীংকালে প্রায়ই সামাজিক বিদ্রোহ হয়. তাছাড়াও ফ্রান্স ও জার্মানীতেও আন্দোলন শুরু হবার সম্ভাবনা আছে. আমেরিকায়ও রাজনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী হতে পারে. প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিনী নাগরিক ‘ওয়াল স্ট্রীট দখল করো’ আন্দোলনে সামিল হয়েছে. বড় বড় শহরে ধনী লোকেদের ওপর খাজনার পরিমান বাড়ানোর দাবী ক্রমশঃ জোরদার হচ্ছে. ‘ওয়ালস্ট্রীট দখল করো’ নামক স্বতঃস্ফূর্ত  আন্দোলন পূর্ণমাত্রার রাজনৈতিক পার্টিতে রূপান্তরিত হতে পারে.

   রাজনীতিবিদেরা এই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে. এর উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন বারাক ওবামা, যিনি আন্দোলনের সূচনায় ঘোষণা করেন, যে তিনি আন্দোলনকারীদের সাথে একমত.

  কিন্তু ‘ওয়াল স্ট্রীট দখল করো’ শ্লোগান কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্যে ‘ক্ষমতা দখল করো’ নামক যুদ্ধের ডাকে পরিণত হতে পারে. বিশেষজ্ঞদের দৃঢ়বিশ্বাস, যে বর্তমানের আন্দোলন পশ্চিম ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে.