এই বছরের মধ্যেই দ্বিতীয় বার আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই এর ভারত সফর, দুই দেশের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর ও অন্যান্য বহু দলিলে চুক্তি ইসলামাবাদকে উদ্বিগ্ন করেছে. পাকিস্তানের বিশ্লেষকেরা নিজেদের দেশের ক্রমবর্ধমান একঘরে হয়ে যাওয়া নিয়েও কথা তুলেছেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্ক্যাণ্ডালের পরে একেবারেই চোখের সামনে উপস্থিত হয়েছে.

    পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুভব করা হয়েছে যে, আফগানিস্তানের পেন্ডুলাম ভারতের দিকেই দুলেছে. এখন অবধি কাবুল এই ধরনের স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার কোন চুক্তি বিশ্বের অন্য কোনও দেশের সঙ্গেই করে নি. এই ধরনের একেবারেই আলাদা দুটি দেশের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা – একদিকে পারমানবিক শক্তি সম্পন্ন বিশ্বের এক বৃহত্তম গণতন্ত্র ও অর্থনীতির দেশ ও অন্যদিকে দারিদ্র জর্জর ও বিদেশী সৈন্যদল অনুপ্রবিষ্ট আরেক দেশ – খুবই অদ্ভূত মনে হয়েছে. আর এই ধরনের সহযোগিতা একেবারেই সমান অধিকার সম্পন্ন দুটি দেশের মতো হতে পারে না.

    ইসলামাবাদে, দেখাই যাচ্ছে যে, ভয় পেয়েছে ভারতীয়রা ২০১৪ সালে আমেরিকার জায়গা নেবে বলে, যখন মার্কিন ও ন্যাটো জোটের সেনারা এই দেশ ছেড়ে চলে যাবে. বিশেষ করে ইসলামাবাদের মনে হয়েছে যে, এই স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার চুক্তি কাবুলকে নতুন করে আফগানিস্তানের সেনা বাহিনী তৈরী করে দেওয়ার জন্যেই করা হয়েছে, যাতে বিদেশী সৈন্যরা চলে গেলে, আফগানিস্তান একাই সশস্ত্র জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়তে পারে.

    হামিদ কারজাই দিল্লী শহরে এক গুচ্ছ অর্থনৈতিক চুক্তিও করেছেন. ভারতীয় কোম্পানীরা এর পর থেকে নিজেদের বিনিয়োগ আফগানিস্তানে সুরক্ষিত করতে পারবেন ও এই দেশ কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন. ভারত এখনই আফগানিস্তানের এক প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ. তারা সেখানে পরিকাঠামো নির্মাণে খরচ করছে, পার্লামেন্টের ভবন তৈরী করে দিয়েছে, প্রচুর পরিমানে সড়ক তৈরী করছে. ভারতে প্রশিক্ষণ পাওয়ার জন্য আরও বেশী করে আফগানিস্তান থেকে ছাত্ররা আসছে, আর আফগানিস্তানে যাচ্ছেন বেশী করে ভারতীয় কোম্পানী ও বিশেষজ্ঞরা. এটা পাকিস্তানের পক্ষে খুবই কষ্ট করে চেপে রাখা ঈর্ষা ও বিরক্তির সৃষ্টি করেছে. কারণ এই কিছু দিন আগেও ইসলামাবাদ একাই আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড়াই করতে পারত. ইসলামাবাদ এমনকি অন্য কোন দেশের পক্ষ থেকে প্রশাসন ও তালিবদের মধ্যে আফগানিস্তানে শান্তি আলোচনার প্রয়াসেরও বিরুদ্ধতা করেছিল.

    ইসলামাবাদে ভয় পাওয়া হয়েছে যে, কাবুল ও দিল্লীর লক্ষ্য অনুযায়ী যে জোট, তা এই অঞ্চলে শক্তির ভঙ্গুর ভারসাম্যকেই নষ্ট করে দেবে. কারজাই এর দিল্লী সফর পাকিস্তানে খুবই অল্প করে মন্তব্য করা হয়েছে. "দুই দেশই (ভারত ও আফগানিস্তান) – স্বাধীন. তারা সব কিছুই করার অধিকার রাখে, যা করতে চায়", - ঘোষণা করেছেন অংশতঃ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানি.

    রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ফেলিক্স ইউরলভ কিন্তু উল্টো দিকে, ভারত আফগানিস্তানের নৈকট্যকে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বাড়ানোর অংশ বলেই দেখেছেন, তিনি বলেছেন:

    "আমি মনে করতে পারতাম যে, ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক – একটি ইতিবাচক অংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বাড়ানোর কাজই করবে. যদিও, অবশ্যই সমস্যাও রয়েছে এবং সব কিছুই এত সহজ ও একই রকমের নয়".

    আফগানিস্তান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে, দেখাই যাচ্ছে যে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে বা ঝগড়া করা নিজেদের জন্য সুবিধাজনক মনে করছে না. আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দিনই দিল্লীতে সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন যে, ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক, যা তৈরী হয়েছে, তা আফগান ও পাক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হবে না. "পাকিস্তান আমাদের যমজ ভাই, আর ভারতবর্ষ, আমাদের বড় বন্ধু", - তিনি এই কথা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন, দিল্লীতে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ে. এবারে প্রশ্ন হল, এই ঘোষণার পরে কি কাজ করা হতে চলেছে.

    যেভাবেই হোক না কেন, এই ত্রিভুজ – ভারত – পাকিস্তান – আফগানিস্তান, হামিদ কারজাইয়ের দিল্লী সফরে পরে কিছুটা অন্য আকার নিয়েছে – একেবারেই খোলাখুলি ভাবে অসমবাহু হয়েছে.