দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা) বেসরকারী জোটে যোগ দেওয়ার পরে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নিজেদের জোটের শক্তি পরীক্ষার সামনে পড়তে হলে দেশ গুলিকে. ৭ই অক্টোবর তিব্বতের বৌদ্ধ গুরু চতুর্দশ দালাই লামার দক্ষিণ আফ্রিকা সফর এখন বাতিল হওয়ার বিপদে পড়েছে – দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার এখন অবধি তাঁকে দেশে প্রবেশের জন্য ভিসা দেয় নি. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে – চিনের সঙ্গে সম্পর্ক যাতে খারাপ না হয়, সেই আশঙ্কাতেই এটা ঘটেছে.

    প্রত্যেক বারই যখন কোন না কোন দেশের নেতা দালাই লামার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখনই এটা বেইজিং এর তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে – এমনকি তার পরেও, যখন এই বছরেরই বসন্তে তিনি স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক দায়ভার ত্যাগ করে শুধু ধর্মীয় গুরুর দায়ই নিজের উপরে রেখেছেন. এই বছরের জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা দালাই লামাকে স্বাগত জানিয়েছেন – তখনই সরকারি ভাবে বেইজিং তীব্র সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটনকে. আর আগষ্ট মাসে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নিকোল্যা সারকোজি তো তিব্বতের বৌদ্ধ দের নেতার সঙ্গেই দেখা করার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন.

    দক্ষিণ আফ্রিকাতে দালাই লামা আসতে চেয়েছিলেন ব্যক্তিগত সফরে, যাতে তাঁরই মতো নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আর্খিএপিস্কোপ ডেসমন্ড টুটু কে তাঁর আশি বছরের জন্মদিনে অভিনন্দন জানানো সম্ভব হয়. যদিও এই সাক্ষাত্কারের কথা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত ভাবেই ও একই সঙ্গে বেশ কিছু প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা তাঁকে ভিসা দেওয়ার কথা বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা তবুও তাঁকে ভিসা দেয় নি ও সম্ভবতঃ ৭ই অক্টোবরের আগে দেবেও না, এই কথা মনে করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

    "যেমন ২০০৯ সালেও ঘটেছিল, যখন দালাই লামাকে তাঁর বিশ্বের সমস্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত মানুষের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা. আকর এই রকমের একই সময়ে যা ঘটছিল, তাও বোধহয় হঠাত্ করেই নয় – সেই ২০০৯ সালে চিন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম আর্থ বাণিজ্যে সহকর্মী দেশ.

    আর এই বারেও দালাই লামাকে ভিসা দেওয়ার বিষয়ে চিনের "চরণ চিহ্ন" স্পষ্ট করেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. বর্তমানে চিনে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ পদস্থ এক সরকারি সফরের দল, যাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন উপ রাষ্ট্রপতি ক্গালেমা মতলান্থে. এই সফরের উদ্দেশ্য – চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ. আর এই বারে মনে তো হয় না যে, হঠাত্ করেই এই ভিসা সংক্রান্ত স্ক্যাণ্ডাল চলার সময়ের সবচেয়ে উতপ্ত মুহূর্তে চিন প্রজাতন্ত্রের উপ সভাপতি সি ঝিনপিন তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকার অতিথিদের তিব্বত প্রশ্নে চিনের অবস্থানের "অমূল্য সমর্থনের" জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন".

    দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্ব চায় না তাঁদের প্রধান আর্থ বাণিজ্য সহচর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে. চিনের আফ্রিকাতে স্বার্থ প্রকাশ আজ আর কারও অবিদিত নেই, তারা বেশী করেই এই কালো মহাদেশে প্রবেশ করছে. কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে চিন – যদিও নেতৃস্থানীয় দেশ, কিন্তু তাও দক্ষিণ আফ্রিকার একমাত্র বাণিজ্য সহচর নয়. তিব্বতের বৌদ্ধ দের ধর্ম গুরুকে ভিসা না দিতে চাওয়া মনে তো হয় না যে, দক্ষিণ আফ্রিকার আরও এক সহকর্মী দেশ ও ব্রিকস সংস্থার মিত্র ভারতের আনন্দের কারণ হবে. যেখানে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেই চিনে তিব্বত থেকে বিতাড়িত হয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন দালাই লামা. আর ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক কিছু কম ঘনিষ্ঠ নয় – তার ওপরে দুই দেশের মধ্যেই রয়েছে বহু দিনের ঐতিহাসিক যোগসূত্র. এটা যেমন অর্থনৈতিক সহযোগিতা, তেমনই সেখানে বিশাল সংখ্যক ভারতীয়ের বসবাস (দক্ষিণ আফ্রিকাতে দশ লক্ষেরও বেশী ভারতীয় বাস করেন), আর শেষমেষ, দুই দেশই ব্রিকসের সদস্য.

    ভিসা সংক্রান্ত স্ক্যাণ্ডাল দক্ষিণ আফ্রিকাতে আভ্যন্তরীণ সঙ্কট তৈরী করতে পারে দেশের রাজনীতিতে, এই রকম মনে করে ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

    "দালাই লামা- শুধু একজন ব্যক্তিই নন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন, যিনি তাঁরই মতন আরও একজন পুরস্কার প্রাপ্ত লোকের আমন্ত্রণে আসতে চেয়েছিলেন ও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেন নি. তাঁকে ভিসা দিতে অস্বীকার করা দেশের ভিতরেই সঙ্কটের সৃষ্টি করতে পারে. অন্ততঃ, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরোধী পক্ষ এখনই তৈরী রয়েছে এটাকে তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের হাতিয়ার করতে".

    "ব্রিকস জোটে চিনের সহকর্মী দেশ হিসাবে আমরা আমাদের সম্পর্ক তাদের সঙ্গে সমান অংশীদারের মতই দেখতে বাধ্য, কোন ভাবেই তা আজ্ঞাবহ হিসাবে নয়", - এই কথাই ইতিমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা দেশের প্রধান বিরোধী দল গণতান্ত্রিক জোটের প্রতিনিধি ঘোষণা করেছেন.