আফগানিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বুরখানুদ্দিন রব্বানি হত্যার পরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সমস্যার উপরে আলোকপাত হয়েছে: তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, বর্তমানের আফগানিস্তানের সরকার বা তাদের পশ্চিমের থেকে আসা স্পনসর কেউই এই দেশে মজবুত ও স্থিতিশীল শান্তি বজায় রাখতে পারছে না, যা প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই রক্তাক্ত যুদ্ধে বিধ্বস্ত.

    ভাবতে বসবো না কে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ও তালিবদের সঙ্গে প্রধান আলোচনা কারীর এই হত্যার নেপথ্যে দাঁড়িয়েছিল – একটাই স্পষ্ট যে, এটা সেই সব শক্তি ছিল, যাদের আভ্যন্তরীণ আলোচনা চালু হওয়ার বিষয়ে স্বার্থ ছিল না, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "এই ধরনের শক্তি তালিবদের মধ্যেও রয়েছে, আর সেই সব শক্তি দের মধ্যে রয়েছে, যারা বর্তমানের প্রশাসন এমনকি পশ্চিমের স্পনসর দের মধ্যেও. আজ প্রত্যেক স্বার্থান্বেষু পক্ষই নিজেদের বিরোধী পক্ষের লোকেদের দোষ দিতে চাইছে, নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতার হত্যাকে ব্যবহার করে. আর সত্য আমরা, সম্ভবতঃ কোন দিনও জানতে পারবো না, যেমন আজও জানি না, কে বা কারা আজ থেকে দশ বছর আগে আখমাদ শাহ মাসুদের মৃত্যুর পিছনে ছিল. কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে মজবুত ও স্থিতিশীল শান্তি আফগানিস্তানে আনতে হলে প্রয়োজন পড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের দীর্ঘ দশ বছরের সামরিক অপারেশনের সময়ে থাকা সেই সমস্ত নিজেদের একেবারে অসফল প্রমাণ করা শক্তির বদলে নতুন শক্তি ডাকার".

    কয়েকদিন আগে ভারতের হিন্দু সংবাদপত্রে বড় একটা প্রবন্ধ বেরিয়েছে, যাতে সেই সমস্ত আঞ্চলিক সংস্থার ভূমিকাকে বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে, যেমন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, যেখানে আফগানিস্তানের একেবারে প্রতিবেশী তিনটি দেশ ভারত, পাকিস্তান ও ইরান – পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে, আর আফগানিস্তান নিজে যদিও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় কোন সরকারি পদে নেই, তবুও এই সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে থাকে.

    আসলে, পশ্চিমের দেশ গুলির তুলনায়, যাদের জন্য আফগানিস্তান – দূরের দেশ, আর বিশ্ব জোড়া সামগ্রিক ভাবে মরক্কো থেকে পাকিস্তান অবধি একেবারেই পশ্চিমের (প্রাথমিক ভাবে আমেরিকার) নিয়ন্ত্রণে "বিশাল নিকট প্রাচ্য" তৈরী করার কাজে একমাত্র যাদের কাছে আফগানিস্তানের অর্থ আছে, তাদের তুলনায় প্রতিবেশী দেশ গুলির উপরে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি সরাসরি ভাবে প্রভাব ফেলে. আর এই খান থেকেই চরমপন্থী ঐস্লামিক মতবাদের, মাদকের বন্যার, সন্ত্রাসের বিপদ উদ্ভূত হয়. একই সময়েই প্রতিবেশী দেশ গুলিই আফগানিস্তানের সঙ্গে বহু দিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ রেখেছে, তারই সঙ্গে এই খানে থাকা জনতার মধ্যে আত্মীয়তাও এই বন্ধনকে মজবুত করে. এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও উজবেকিস্তান একে অপরকে পারস্পরিক ভাবে বদল করে থাকে, তাদের আফগানিস্তানের ভিতরে বিভিন্ন ভাগের উপরে প্রভাবও রয়েছে. প্রসঙ্গতঃ এর মধ্যেই প্রধান বিপদ রয়েছে: যখন বহু প্রজাতির ও বহু সংস্কৃতির দেশে বিভিন্ন প্রজাতি ও ধর্ম মতের লোকেরা ক্ষমতার লড়াই শুরু করে, তখন সেই সমস্ত দেশের পক্ষ থেকেও যারা তাদের সমর্থন করে, প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা করতে দেখতে পাওয়া যায়.

    তা স্বত্ত্বেও, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা দেশ গুলির সম্মিলিত ক্ষমতা, তার মধ্যে পর্যবেক্ষক  দেশও রয়েছে, আমাদের বলতে দেয় যে, একমাত্র তারাই, পশ্চিমের কোন দেশ নয়, ক্ষমতা রাখে আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল শান্তি আনার মতো. আজ পাকিস্তান ও ভারত আফগানিস্তানে তাদের পক্ষ থেকে সব চেয়ে বেশী কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব রেখেছে – কাবুলে রাষ্ট্রদূতাবাস ছাড়াও হেরাত, কান্দাহার, জালালাবাদ, মাজারি শরীফে রয়েছে দূতাবাস দুই দেশেরই. নিজেদের দিক থেকে চিন আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কারী  - যখন পশ্চিম নিজেদের নিয়ম সশস্ত্র যুদ্ধের পথে শেখাতে চাইছে, তখন চিন নিজেদের অর্থ দিয়ে ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এখানের অর্থনীতিকে বিকাশের চেষ্টা করছে".

    এখন কাজ অল্পই বাকি – কিন্তু এই অল্প কাজ টুকুতেই রয়েছে সবচেয়ে বড় সমস্যা. কি করে এমন করা যায় যে, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ গুলির স্বার্থ যাতে বিরোধের পথে না গিয়ে সহযোগিতার পথেই যায়? শেষমেষ স্থিতিশীল ও শান্তি পূর্ণ আফগানিস্তান নিয়ে সকলেই উত্সাহী – আর এই লক্ষ্য যেন এই মুহূর্তের নির্দিষ্ট ফলের চেয়ে বেশী দামী হয়.