ঠিক একই রকমেরই শান্ত সেপ্টেম্বর মাসের দিন গুলিতে দূরের সেই ১৯৩০ সালে মস্কো শহর অতিথি বত্সল ভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বাগত জানিয়েছিল. বয়স অনেক হওয়া ও শরীর ভাল না হওয়া স্বত্ত্বেও, বিশ্ব বন্দিত কবি ও লেখক, এশিয়ার প্রথম সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ বিজয়ী, খুবই সাগ্রহে সোভিয়েত রাশিয়াতে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন. তিনি নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন এই দেশের পরিবর্তন, যে দেশ সম্বন্ধে তাঁর সব সময়েই আগ্রহ ছিল. রবীন্দ্রনাথ এখানে এসে দেখা করেছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে, যুব দের সঙ্গে, যৌথ খামারের লোকেদের সঙ্গে ও কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে. সেই সময়ের সাক্ষাত্কার গুলির ফোটো ও মস্কো এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর, রবীন্দ্রনাথের এই সফর নিয়ে লেখা "রাশিয়ার চিঠি" ও তাঁর অন্যান্য রচনা প্রদর্শনী করা হয়েছে আমাদের দেশে সদ্য উদ্বোধন করা হয়েছে এমন এক প্রদর্শনীতে. সেই প্রদর্শনী চলছে মস্কোর রুশ রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের প্রাচ্য সাহিত্য কেন্দ্রে ও তা উত্সর্গিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে. এই কেন্দ্রের পরিচালকদের এক সদস্য আলেকজান্ডার সামারিন উল্লেখ করেছেন যে, কেন্দ্রে ভারতীয় ভাষায় ৬০ হাজার জার্নাল ও বইয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা এক বিশেষ জায়গা নিয়েছে, তিনি বলেছেন:

"রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকে রাশিয়াতে সব সময়েই বিশাল মনোযোগ ও আগ্রহ দিয়ে দেখা হয়েছে. তাঁর কবিতার সর্ব প্রথম অনুবাদ বেরিয়েছিল বিপ্লব পূর্ব রাশিয়াতে একশ বছর আগে. এটা ছিল বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ "গীতাঞ্জলি". আর সেই বই এই প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আরও বহু রচনা ও তার অনুবাদ. আমাদের দেশে সেই বই গুলি বেরিয়েছিল বহু লক্ষ কপি ছাপা হয়ে. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য, তাঁর নাটক নিয়ে সিনেমা  হয়েছে, বহুবারই দেশের নামী প্রেক্ষাগৃহ গুলিতে তাঁর রচনা অবলম্বনে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে. তাঁর সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন বর্তমানের রুশ সঙ্গীত স্রষ্টা ও শিল্পীরা".

প্রাচ্য সাহিত্য কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির সমস্ত রকম ধারাকেই প্রদর্শন করা হয়েছে. তার মধ্যে – তাঁর আঁকা ছবিগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পঞ্চাশ টির প্রতিরূপ এখানে দেখানো হয়েছে. ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির সত্যিকারের নবজন্মদাতা, যিনি জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথ এই ছবিগুলিতে আমাদের সামনে এক প্রতিভাশালী শিল্পী রূপে আবির্ভূত হন. তাঁর ছবিতে রেখার আঁচড় সেই সমস্ত প্রশ্ন গুলির সঙ্গেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত রয়েছে, যা তিনি তাঁর সাহিত্যে, প্রবন্ধ রচনায় একজন শিক্ষক ও আলোক বাহী হিসেবে বারবার তুলেছেন. তাঁর সৃষ্টি নারীর ছবি খুবই সঙ্গীতময়, মহিলার অবয়ব – মায়ের ছবি. তাঁর আপন বাংলার প্রকৃতির বিভিন্ন নৈসর্গিক দৃশ্য, ভারতের অন্য জায়গার  ছবি, তা রক্ষার আকুতি দিয়ে পূর্ণ. এই ছবি গুলি বাছাই করা ও প্রদর্শনীর সমস্ত দ্রষ্টব্য বস্তু গুলিকে এক জায়গায় করার কাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন প্রাচ্য সাহিত্য কেন্দ্রের কর্মী স্মিতা সেনগুপ্ত. মস্কোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী, সুন্দর রুশ ভাষার দখল থাকায়, স্মিতা খুবই আগ্রহের সঙ্গে এই কেন্দ্রে আগতদের নিজের মহান স্বদেশ বাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, পরামর্শ দিয়ে. যারা আজ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় করার জন্য এই কেন্দ্রে আসছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন স্কুলের ছেলেমেয়েরা, ছাত্রছাত্রীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা, শিল্পী, অভিনেতা ও নাটকের পরিচালকেরা. এই কথা উল্লেখ করে স্মিতা বলেছেন:

"মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া আফ্রিকা ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি অবশ্য রুশী অনুবাদে পড়ে থাকেন মস্কো সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়া জাতীয় মানবিক বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট পিটার্সবার্গের বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ও রাশিয়ার অন্যান্য জায়গার বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ছাত্রছাত্রীরা. সব সময়েই আনন্দের সঙ্গে আমি বেছে দিই মঞ্চস্থ করার উপযুক্ত রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে উদ্ধৃতি, সাহিত্য বা শিল্প সন্ধ্যায় আবৃত্তির জন্য কবিতা. রবীন্দ্রনাথের রচনার মধ্যে একটি রচনা খুবই এখানে জনপ্রিয় – "সোনার তরী" – এক প্রতীকী রচনা – যেখানে এই নৌকার চালককে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগৃহীত সমস্ত মূল্যবান বস্তু, প্রকৃতির সম্পদ উন্মুক্ত হাতে দান করছেন, এমনকি নিজের জন্য জায়গা না রেখে. রাশিয়ার পাঠকেরা এই "সোনার তরী" নামক নৌকায় তুলে দেওয়া রবীন্দ্রনাথের সম্পদের সঙ্গে খুবই আগ্রহ সহকারে পরিচিত হন – যা তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও নিজেদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভার বহু দিকেরই উন্মোচন করেন".

মস্কোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনী চলছে রাশিয়াতে ভারতীয় সংস্কৃতি উত্সবের দিন গুলির মধ্যেই. এই উত্সবের মধ্যেই আয়োজন করা হয়েছে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, তার নাম "রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বিশ্ব".