শনিবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভায় বক্তৃতা দেবেন. মনে করা হয়েছে যে, তাঁর বক্তৃতার প্রধান উদ্দেশ্য হবে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে সম্ভাব্য স্থায়ী সদস্য পদের বিষয় নিয়ে.

    বিগত বছর গুলিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের আমূল সংশোধনের দাবী বেশী করেই শোনা যাচ্ছে. নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দের সংখ্যা একই সঙ্গে ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ স্থাপনের সময়েই স্থির করা হয়েছিল. তার পর থেকেই বিশ্বে বিশাল পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে. এই পরিস্থিতিই অনেক দিন ধরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের আমূল পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে ও প্রাথমিক ভাবে, প্রধান সংস্থার, যেখানে ভাগ্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেই নিরাপত্তা পরিষদেরই. কিন্তু সংশোধনের প্রক্রিয়া দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবের তুলনায় দেরী করছে.

    উপর থেকে দেখলে, কেউই আরও কিছু দেশ ও ভারতবর্ষের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসাবে প্রবেশের বিরুদ্ধে নেই. কিন্তু কাজ এগোচ্ছে না – এই পথে কাঁটার সংখ্যা অনেক, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "ভারতবর্ষের প্রার্থী পদের বিরুদ্ধে আজ বিশ্বের একটি দেশও খোলাখুলি ভাবে বিরুদ্ধতা করছে না – এমনকি ভারতবর্ষের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে প্রধান এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী চিনও – যারা এই বছরেরই গরম কালে ঘোষণা করেছে যে, তারা ভারতের প্রার্থী পদের সমর্থনই করবে, তবে এটাও সত্য, যে তার জন্য বেশ কয়েকটি শর্তও আরোপ করেছে. বোঝাই যাচ্ছে যে, ভারতবর্ষ অধিকার বলেই এক অন্যতম প্রথম প্রার্থী হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য – তা যেমন নিজেদের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যার ক্ষমতায়, তেমনই আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভূমিকার জন্য. আজকের দিনে ভারতবর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশে, কিন্তু সেটা শুধুই অস্থায়ী ভাবে – ২০১২ সালের শেষ পর্যন্ত. নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে একেবারে সর্বশেষ নয়, এমন ভূমিকা এই বিষয়ও নিয়েছে যে, ভারতবর্ষের কাছে পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে. কিন্তু ভারতের মতই একই ধরনের মর্যাদার দাবী করেছে আরও কয়েকটি দেশ. আর এখানেই চট করে অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়".

    যদি রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্যরা পারমানবিক ক্লাবের সদস্যরাই হন, তবে সরকারি ভাবে এই মর্যাদা পাওয়ার জন্য দাবী করতে পারে পারমানবিক শক্তিধর ও যে সমস্ত দেশ তার কাছাকাছি, তারা সবাই, আর তাদের মধ্যে কয়েকটি গ্রহণ করার বিষয়ে বিশ্ব সমাজ কখনোই একমত হবে না.

    বাধ্যতা মূলক ভাবে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য পদের দাবী তুলেছে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও আরব লীগের উন্নতিশীল দেশ গুলিও. শেষমেষ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের জন্য নেতৃস্থানীয় অর্থনৈতিক ভাবে বড় দেশ গুলিও দাবী করেছে – জার্মানী ও জাপান. এই সমস্ত দেশকে গ্রহণ করা (আর তারই সঙ্গে ভেটো প্রয়োগের অধিকার দেওয়া) বাস্তবে হতে পারে যে, নিরাপত্তা পরিষদেই নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ.

    সবচেয়ে সম্ভাব্য চারটি প্রার্থী দেশের - ভারতবর্ষ, জার্মানী, জাপান ও ব্রাজিল – এক বেসরকারি দল জি ৪ নামে বানিয়ে ফেলেছে, নিজেদের মধ্যে এই বিষয়ে সহমতে এসে যে, একসাথে কাজ করবে.

    কিন্তু জাপানের পদ পাওয়ার একেবারেই বিরুদ্ধে আছে চিন. তাছাড়া জি ৪ এর মধ্যেও ভিন্ন মত রয়েছে – যেমন, জার্মানী ধীরে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে, যে পথে নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি দেশ গুলি একসঙ্গে ভেটো প্রযোগের অধিকার অর্জন করবে না. ভারত চায় সবই একসাথে পেতে. আর এটা বোধহয় হবেই না, মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

    "যদি ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের পড়ুয়াদের শেষ কিছু দিনের মনমোহন সিংহের আসন্ন বক্তৃতার সম্বন্ধে মন্তব্য পড়ে দেখা হয়, তবে সেই ভারতেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী পদ অর্জনের ধারণা তেমন জনপ্রিয় নয়. দেশের ভিতরেই খুব বেশী করে সমস্যা জড় হয়েছে এটা যেমন দারিদ্র ও দুর্নীতি, তেমনই জমি ও নির্বাচন সংক্রান্ত সংশোধন, ও আরও অনেক কিছুই. সুতরাং খুবই বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে যে এই বারেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অকূল আহ্বান কোনও নির্দিষ্ট ও দ্রুত ফল দেবে বলে".

    রাশিয়া, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন ভারতবর্ষের রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদে পদ পাওয়া কোন দ্বিমুখী মত ছাড়াই সোজাসুজি সমর্থন করে. গত বছরে, ভারতীয় লোকসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ও ভারতের প্রার্থী পদে নিজের সমর্থন প্রকাশ করেছেন. এর আগের প্রশাসন নিরাপত্তা পরিষদের প্রসারের বিরুদ্ধে ছিল. সোভিয়েত দেশ পতনের পরে, ১৯৯০ এর দশকে ও ২০০০ এর শুরুতে বাস্তবে বিশ্বের এক মেরু কাঠামো তৈরী হয়েছিল, আর সেই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রয়োজন ছিল না শুধু মাত্র রাষ্ট্রসঙ্ঘের সংশোধনে, বরং বেশী করেই বলা যায় এই সংস্থারও. বহু সিদ্ধান্তই তখন মার্কিন প্রশাসন নিয়েছে শুধু রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে শুধু অগ্রাহ্য করেই নয়, বরং বলা যায় তার সোজাসুজি ভঙ্গ করেই.

    কিন্তু আজ এক মেরু বিশিষ্ট বিশ্ব অতীতের বিষয় হয়েছে. রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের গঠন বাস্তবের সঙ্ঘে উচিত্ ভাবে পাল্টানোর কথা আজ প্রায় সকলেই বলছে. কিন্তু, যেমন বোঝা যাচ্ছে, সব কিছু মানিয়ে গুছিয়ে কথা বলা এটা এক রকম আর নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া – একেবারেই অন্য ব্যাপার.